খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ৩০ই জানুয়ারি ২০২৬, ১:৩ এএম
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) এবং বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) মধ্যে ফার্নেস তেলের দাম নিয়ে দীর্ঘদিনের টানাপোড়েন এখন প্রকাশ্য রূপ নিয়েছে। সম্প্রতি বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) আয়োজিত এক গণশুনানিতে উঠে এসেছে চাঞ্চল্যকর সব তথ্য। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম কমলেও দেশে তার প্রতিফলন না ঘটায় বিপিসি গত দেড় বছরে পিডিবির কাছ থেকে প্রায় ৬৪৪ কোটি টাকা অতিরিক্ত আদায় করেছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
বিপিসি বর্তমানে প্রতি লিটার ফার্নেস তেল বিক্রি করছে ৮৬ টাকায়। অথচ আন্তর্জাতিক বাজারের নিম্নমুখী প্রবণতা বিশ্লেষণ করে পিডিবি দাবি করেছে, বর্তমানে এই তেলের যৌক্তিক মূল্য হওয়া উচিত ৫০ টাকা ৮৩ পয়সা। গত দেড় বছর ধরে বিশ্ববাজারে দাম কমলেও দেশে তা সমন্বয় না করায় সরকারি বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী এই সংস্থাটি চরম আর্থিক চাপের মুখে পড়েছে।
গণশুনানিতে বিপিসি ও তাদের সহযোগী চার বিপণন কোম্পানি (পদ্মা, মেঘনা, যমুনা ও স্ট্যান্ডার্ড এশিয়াটিক অয়েল) প্রতি লিটার ফার্নেস তেলের দাম ৮১ টাকা নির্ধারণের প্রস্তাব দেয়। তবে বিইআরসি-র কারিগরি কমিটি তাদের পর্যালোচনায় লিটার প্রতি ৭৪ টাকা ৪ পয়সা নির্ধারণের সুপারিশ করেছে। পিডিবির চেয়ারম্যান মো. রেজাউল করিম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো নিজেরা আমদানি করায় তাদের খরচ অনেক কম পড়ছে, অথচ আমাদের বিপিসির কাছ থেকে চড়া দামে তেল কিনতে হচ্ছে।”
নিচে ফার্নেস তেলের প্রস্তাবিত ও বর্তমান দামের একটি তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরা হলো:
| পক্ষ/সংস্থা | প্রস্তাবিত প্রতি লিটার দাম (টাকা) | মন্তব্য |
| বিপিসি (বর্তমান মূল্য) | ৮৬.০০ | বর্তমানে কার্যকর রেট |
| বিপিসির নতুন প্রস্তাব | ৮১.০০ | বিপণন মার্জিন বৃদ্ধির দাবি সহ |
| বিইআরসি কারিগরি কমিটি | ৭৪.০৪ | পর্যালোচনামূলক সুপারিশ |
| পিডিবির দাবি | ৫০.৮৩ | আন্তর্জাতিক বাজার দরের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ |
পিডিবির পরিচালক জাহাঙ্গীর আলম মোল্লা শুনানিতে জানান, গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে পিডিবি সরকারকে ৩৮ হাজার ৬৩৭ কোটি টাকা ভর্তুকি দিতে বাধ্য করেছে এবং এরপরও সংস্থাটির নিজস্ব লোকসান দাঁড়িয়েছে ১৭ হাজার ২১ কোটি টাকা। বিপরীতে, একই সময়ে তেল বিক্রি করে বিপিসি ৪ হাজার ৩১৬ কোটি টাকা নিট মুনাফা করেছে। পিডিবির দাবি, এই বিপুল পরিমাণ লোকসানের পেছনে ফার্নেস তেলের উচ্চমূল্য একটি প্রধান কারণ।
দেশে বর্তমানে মোট ৫৪টি ফার্নেস তেলচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্র রয়েছে। গত অর্থবছরে বিদ্যুৎ উৎপাদনে প্রায় ২৩ লাখ টন ফার্নেস তেল ব্যবহৃত হয়েছে। এই বিপুল চাহিদার মাত্র ২০-২৫ শতাংশ বিপিসি সরবরাহ করে, বাকিটা বেসরকারি খাত সরাসরি আমদানি করে। সরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো বিপিসির ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় তারা বাজার সুবিধার সুফল পাচ্ছে না।
তেল বিপণন কোম্পানিগুলো তাদের বিতরণ চার্জ (মার্জিন) লিটার প্রতি ৫৫ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ১ টাকা ২০ পয়সা করার দাবি জানিয়েছে। তবে বিইআরসি কারিগরি কমিটি এটি ৮৫ পয়সা করার সুপারিশ করেছে। মজার ব্যাপার হলো, মার্জিন বাড়ানোর দাবি করলেও পদ্মা অয়েলের মতো কোম্পানিগুলো স্বীকার করেছে যে গত অর্থবছরে তাদের মোট মুনাফা আগের চেয়ে বেড়েছে।
শুনানি শেষে বিইআরসির চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ আশ্বস্ত করেছেন যে, সব তথ্য ও উপাত্ত বিশ্লেষণ করে একটি ভারসাম্যপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। আগামী ৩ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত এই বিষয়ে যেকোনো পক্ষ লিখিত মতামত দিতে পারবেন। যদি দ্রুত দাম সমন্বয় করা না হয়, তবে আসন্ন গ্রীষ্ম মৌসুমে বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ বৃদ্ধির কারণে লোডশেডিং এবং সরবরাহ সংকট তীব্র হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
মন্তব্য