খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: সোমবার, ২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় কাঠামোর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ হলো স্বাস্থ্য খাত। একটি সুস্থ ও সবল জাতি গঠনের প্রধান কারিগর হওয়ার কথা ছিল স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের। কিন্তু বর্তমান প্রেক্ষাপটে এই মন্ত্রণালয়টি জনসেবার পরিবর্তে অব্যবস্থাপনা, নীতিহীনতা এবং দুর্নীতির এক অন্ধকার আবর্তে নিমজ্জিত হয়েছে। হাজার হাজার কোটি টাকার জাতীয় বাজেট এই খাতে বরাদ্দ থাকলেও সাধারণ মানুষের ভাগ্যে জুটছে কেবল বঞ্চনা আর ভোগান্তি। সরকারি হাসপাতাল থেকে শুরু করে তৃণমূল পর্যায়ের কমিউনিটি ক্লিনিক—সবখানেই সেবার মান আজ প্রশ্নবিদ্ধ।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের প্রাণকেন্দ্র সচিবালয় এখন জনস্বার্থের চেয়ে ব্যক্তিস্বার্থ উদ্ধারের কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের বড় একটি অংশ নিজেদের পদোন্নতি, সুবিধাজনক বদলি এবং প্রভাব বিস্তার নিয়ে এতটাই ব্যতিব্যস্ত যে, সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্য সুরক্ষার বিষয়টি তাদের কাছে গৌণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। নীতি নির্ধারণী পর্যায়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণে ধীরগতি এবং জবাবদিহিতার অভাব পুরো স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে পঙ্গু করে দিচ্ছে। মন্ত্রণালয়ের রন্ধ্রে রন্ধ্রে জেঁকে বসা রাজনৈতিক প্রভাব ও দলীয় ঘনিষ্ঠতা দক্ষ ও সৎ কর্মকর্তাদের কাজের পরিবেশ নষ্ট করছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর চিকিৎসাসেবার ওপর।
প্রতি বছর বাজেটে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বাড়লেও মাঠ পর্যায়ে তার প্রতিফলন দেখা যায় না। কেনাকাটায় দুর্নীতি এবং যন্ত্রপাতির সঠিক রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে বিপুল পরিমাণ রাষ্ট্রীয় অর্থ অপচয় হচ্ছে। নিচে স্বাস্থ্য খাতের বর্তমান সংকটের একটি চিত্র তুলে ধরা হলো:
| সংকটের ক্ষেত্র | বর্তমান অবস্থা | জনজীবনে প্রভাব |
| হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা | শয্যা সংকট, অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ ও দালালের দৌরাত্ম্য। | দরিদ্র রোগীরা মেঝেতে থেকে বিনা চিকিৎসায় ধুঁকছে। |
| ঔষধ ও সরঞ্জাম | সরকারি ঔষধের কালোবাজারি ও নষ্ট যন্ত্রপাতি। | রোগীদের চড়া মূল্যে বাইরে থেকে সেবা নিতে হচ্ছে। |
| প্রশাসনিক স্বচ্ছতা | নিয়োগ ও পদোন্নতিতে অনিয়ম ও স্বজনপ্রীতি। | যোগ্য চিকিৎসকরা নীতিনির্ধারণী ভূমিকা থেকে বঞ্চিত। |
| তৃণমূল স্বাস্থ্যসেবা | কমিউনিটি ক্লিনিকে জনবল ও উপকরণের অভাব। | গ্রামগঞ্জের মানুষ প্রাথমিক চিকিৎসা থেকেও বঞ্চিত। |
| জরুরি সেবা | অ্যাম্বুলেন্স ও আইসিইউ পেতে দীর্ঘসূত্রতা। | সঠিক সময়ে চিকিৎসার অভাবে অকাল মৃত্যু বাড়ছে। |
অভিযোগ রয়েছে যে, বিগত সরকারের দীর্ঘ শাসনামলে গড়ে ওঠা একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট এখনো স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে সক্রিয়। এই চক্রটি টেন্ডারবাজি, নিম্নমানের সরঞ্জাম ক্রয় এবং ভুয়া ভাউচারের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা লোপাট করছে। অনেক কর্মকর্তা নিজেদের দলীয় পরিচয় ব্যবহার করে ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকছেন। ফলে বড় বড় দুর্নীতির অভিযোগ উঠলেও দৃষ্টান্তমূলক কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে না। এই প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতিই মূলত দেশের সাধারণ মানুষকে আধুনিক ও মানসম্মত চিকিৎসাসেবা থেকে দূরে সরিয়ে রাখছে।
স্বাস্থ্য খাতকে এই পচনশীল অবস্থা থেকে রক্ষা করতে হলে অবিলম্বে আমূল সংস্কার প্রয়োজন। শুধু বাজেট বাড়ালেই হবে না, সেই বাজেটের প্রতিটি পয়সার হিসাব নিশ্চিত করতে হবে। স্বচ্ছতা ফেরাতে ডিজিটাল মনিটরিং সিস্টেম চালু করা এবং দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া এখন সময়ের দাবি। স্বাস্থ্যসেবা কোনো করুণা নয়, এটি নাগরিকের মৌলিক অধিকার। যদি এখনই নীতিগত কঠোরতা অবলম্বন করা না হয়, তবে এই মন্ত্রণালয় কেবল দুর্নীতির আখড়া হিসেবেই পরিচিতি পাবে এবং সাধারণ মানুষ চিকিৎসার অভাবে নিঃস্ব হতে থাকবে।