খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
সন্তান লাভের আশায় চিকিৎসা নিতে এসে ভয়াবহ অপরাধের শিকার হওয়ার ঘটনায় মেহেরপুরে এক কবিরাজকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল এই রায়ের মাধ্যমে সমাজে চিকিৎসার নামে প্রতারণা ও যৌন সহিংসতার বিরুদ্ধে কঠোর বার্তা দিলেন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। ভুক্তভোগী নারীর প্রতি ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার পাশাপাশি এ ধরনের অপরাধ প্রতিরোধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি আরোপের বিষয়টি আদালত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করেছেন।
মঙ্গলবার মেহেরপুরের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক আলী মাসুদ শেখ রায় ঘোষণা করেন। দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তি মুজা শেখ ওরফে মুজা কবিরাজ (৬০), মেহেরপুর সদর উপজেলার পিরোজপুর গ্রামের শেখপাড়ার হযরত আলীর ছেলে। রায়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের পাশাপাশি তাকে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। জরিমানা অনাদায়ে আরও এক বছরের কারাদণ্ড ভোগ করতে হবে। আদালত পর্যবেক্ষণে উল্লেখ করেন, চিকিৎসার আশ্বাস দিয়ে ভুক্তভোগী ও তার পরিবারের আস্থা অর্জন করে অপরাধ সংঘটিত করা হয়েছে, যা অপরাধের মাত্রাকে আরও গুরুতর করে তোলে।
মামলার নথি অনুযায়ী, ২০২১ সালের ৩ মার্চ চুয়াডাঙ্গার দর্শনা উপজেলার বুইচিতলা মাঝপাড়া গ্রামের এক নিঃসন্তান দম্পতি সন্তান লাভের আশায় কবিরাজি চিকিৎসা নিতে মেহেরপুরের পিরোজপুরে যান। কবিরাজ তাদের একটি কক্ষে নিয়ে গিয়ে চিকিৎসার কথা বলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নেন। এক পর্যায়ে ওষুধ দেওয়ার নাম করে স্বামীকে অচেতন করে তিনি গৃহবধূকে ধর্ষণ করেন। ঘটনার পরদিনই ভুক্তভোগী দম্পতি মেহেরপুর সদর থানায় মামলা দায়ের করেন। তদন্ত শেষে পুলিশ অভিযোগের সত্যতা পেয়ে ২০২১ সালের ১৯ নভেম্বর আদালতে চার্জশিট দাখিল করে। বিচারিক কার্যক্রমে সাক্ষ্য-প্রমাণ উপস্থাপনের পর আদালত অভিযোগ প্রমাণিত বলে রায় প্রদান করেন।
রায় ঘোষণার সময় রাষ্ট্রপক্ষে মামলা পরিচালনা করেন পাবলিক প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট মোস্তাফিজুর রহমান তুহিন এবং আসামিপক্ষে ছিলেন অ্যাডভোকেট মিয়াজান আলী। রায় প্রসঙ্গে রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলি বলেন, নিঃসন্তান এক নারী চিকিৎসা নিতে গিয়ে যে ভয়াবহ নির্যাতনের শিকার হয়েছেন, আদালত তার ন্যায়বিচার নিশ্চিত করেছেন। তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন, এ রায়ের মাধ্যমে সমাজে ধর্ষণের মতো জঘন্য অপরাধ দমনে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, গ্রামাঞ্চলে অনিবন্ধিত ও অপ্রাতিষ্ঠানিক চিকিৎসা ব্যবস্থার প্রতি অন্ধ বিশ্বাস অনেক সময় মানুষকে ঝুঁকির মুখে ফেলে। বিশেষ করে সন্তান ধারণে জটিলতা নিয়ে ভোগা দম্পতিরা প্রতারণার শিকার হওয়ার প্রবণতায় পড়েন। এ ধরনের অপরাধ ঠেকাতে সচেতনতা বৃদ্ধি, আইন প্রয়োগকারী সংস্থার তৎপরতা এবং ভুক্তভোগীদের অভিযোগ জানাতে উৎসাহ দেওয়া জরুরি।
মামলার সংক্ষিপ্ত তথ্য
| বিষয় | বিবরণ |
|---|---|
| রায় প্রদানকারী আদালত | নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল, মেহেরপুর |
| বিচারক | আলী মাসুদ শেখ |
| দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তি | মুজা শেখ (মুজা কবিরাজ), বয়স ৬০ |
| অপরাধের তারিখ | ৩ মার্চ ২০২১ |
| অভিযোগ দাখিল | ঘটনার পরদিন |
| চার্জশিট দাখিল | ১৯ নভেম্বর ২০২১ |
| সাজা | যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ও ৫০,০০০ টাকা জরিমানা |
| জরিমানা অনাদায়ে | আরও ১ বছরের কারাদণ্ড |
এই রায়ের মধ্য দিয়ে প্রতারণামূলক চিকিৎসা ও যৌন সহিংসতার বিরুদ্ধে আইনের কঠোর অবস্থান পুনর্ব্যক্ত হলো। একই সঙ্গে ভুক্তভোগীদের ন্যায়বিচারের পথে এগিয়ে আসার সাহস জোগাবে বলে আশা প্রকাশ করেছেন মানবাধিকারকর্মীরা।