খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
চীনের নিয়ন্ত্রণাধীন খনিজ সম্পদের প্রভাব কমাতে যুক্তরাষ্ট্রকে কৌশলগত অংশীদার হিসেবে পাশে পেতে সক্রিয় উদ্যোগ নিয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)। আধুনিক প্রযুক্তি, প্রতিরক্ষা শিল্প, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও বৈদ্যুতিক যান উৎপাদনে অপরিহার্য লিথিয়াম, কোবাল্ট, নিকেল, গ্রাফাইট ও বিরল মৃত্তিকা উপাদানের সরবরাহে চীনের আধিপত্য ভাঙতেই এই উদ্যোগের লক্ষ্য নির্ধারিত হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, আগামী তিন মাসের মধ্যে ইইউ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক সইয়ের প্রস্তুতি চলছে, যার মাধ্যমে যৌথ কৌশলগত অংশীদারত্বের কাঠামো নির্ধারিত হবে।
বর্তমানে বিশ্বব্যাপী গুরুত্বপূর্ণ খনিজের উত্তোলন, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও পরিশোধনের বড় অংশ চীনের নিয়ন্ত্রণে। ফলে বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলে একক দেশের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা তৈরি হয়েছে, যা ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ বা নীতিগত পরিবর্তনের ক্ষেত্রে বড় ঝুঁকি ডেকে আনতে পারে। ইইউ ও যুক্তরাষ্ট্র উভয়ই এই ঝুঁকিকে কৌশলগত দুর্বলতা হিসেবে দেখছে। প্রস্তাবিত অংশীদারত্বের মাধ্যমে বিকল্প উৎস অনুসন্ধান, যৌথ বিনিয়োগ, খনিজ প্রক্রিয়াজাতকরণ সক্ষমতা বাড়ানো এবং মজুদ ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করার পরিকল্পনা রয়েছে।
সমঝোতা স্মারকের খসড়ায় যৌথ প্রকল্পে অর্থায়ন, মূল্য শৃঙ্খলে স্বচ্ছতা, পরিবেশবান্ধব উত্তোলন নীতি এবং শ্রমমান রক্ষার ওপর গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। একই সঙ্গে মিত্র দেশগুলোর সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহ চুক্তি, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার সম্ভাবনাময় খনি অঞ্চলে টেকসই বিনিয়োগ এবং ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকায় পরিশোধন কারখানা স্থাপনের উদ্যোগ অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে। লক্ষ্য হলো কাঁচামাল থেকে চূড়ান্ত পণ্য—পুরো মূল্য শৃঙ্খলে নির্ভরযোগ্য ও নিরাপদ সরবরাহ নিশ্চিত করা।
ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটেও এই উদ্যোগ তাৎপর্যপূর্ণ। সাম্প্রতিক সময়ে খনিজ সম্পদের কৌশলগত গুরুত্ব ঘিরে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে উত্তাপ বেড়েছে। উত্তর আটলান্টিক অঞ্চলে সম্পদ নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনা জোরদার হয়েছে এবং একাধিক দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের বৈঠকে চীনা খনিজের ওপর নির্ভরতা কমানোর সমন্বিত কৌশল নিয়ে কথা হচ্ছে। ইইউ মনে করছে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অংশীদারত্ব গড়ে তুললে প্রযুক্তি স্থানান্তর, অর্থায়ন ও বাজার প্রবেশাধিকারে নতুন গতি আসবে।
তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, কেবল উৎস বৈচিত্র্য করলেই সমস্যা মিটবে না; পরিবেশ সুরক্ষা, স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অধিকার ও খনি-নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে খনিজ পুনর্ব্যবহার ও বিকল্প উপকরণ উদ্ভাবনে গবেষণা বাড়াতে হবে, যাতে দীর্ঘমেয়াদে কাঁচামালের ওপর চাপ কমে।
প্রধান গুরুত্বপূর্ণ খনিজে বর্তমান বৈশ্বিক নির্ভরতার চিত্র (সংক্ষিপ্ত ধারণা)
| খনিজ উপাদান | প্রযুক্তিতে ব্যবহার | প্রক্রিয়াজাতে চীনের প্রভাব (ধারণামূলক) |
|---|---|---|
| লিথিয়াম | বৈদ্যুতিক যান ব্যাটারি, শক্তি সঞ্চয় | উচ্চ |
| কোবাল্ট | ব্যাটারি ক্যাথোড, ইলেকট্রনিক্স | উচ্চ |
| নিকেল | ব্যাটারি, স্টেইনলেস স্টিল | মাঝারি থেকে উচ্চ |
| গ্রাফাইট | ব্যাটারি অ্যানোড, ইস্পাত শিল্প | অত্যন্ত উচ্চ |
| বিরল মৃত্তিকা | চিপ, চুম্বক, প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি | অত্যন্ত উচ্চ |
এই অংশীদারত্ব বাস্তবায়িত হলে ইইউ ও যুক্তরাষ্ট্রের শিল্পখাতে কাঁচামালের ঝুঁকি কমবে, সবুজ প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ বাড়বে এবং বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলে ভারসাম্য ফেরানোর পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হবে।