খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: শনিবার, ৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
আটলান্টিক মহাসাগরের দুই পাড়ে বর্তমানে বইছে দুই ভিন্ন রাজনৈতিক হাওয়া। একদিকে যুক্তরাষ্ট্রে আলোচিত জেফরি এপস্টেইন নথিতে বারবার নাম আসা সত্ত্বেও ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন বেশ ফুরফুরে মেজাজে ওভাল অফিস সামলাচ্ছেন, অন্যদিকে সেই একই নথির পরোক্ষ ধাক্কায় লন্ডনের ১০ নম্বর ডাউনিং স্ট্রিটে কিয়ার স্টারমারের প্রধানমন্ত্রিত্ব এখন খাদের কিনারে। এই পরিস্থিতি কেবল এক ব্যক্তির পতন নয়, বরং ব্রিটিশ ও মার্কিন রাজনৈতিক ব্যবস্থার জবাবদিহিতার এক চরম বৈপরীত্য তুলে ধরেছে।
যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের সঙ্গে জেফরি এপস্টেইনের কোনো সরাসরি যোগাযোগ না থাকলেও তাঁর নিয়োগকৃত গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের অতীত ইতিহাস এখন বুমেরাং হয়ে ফিরে এসেছে। সংকটের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন লেবার পার্টির এক সময়ের প্রভাবশালী নেতা ও সাবেক ক্যাবিনেট মন্ত্রী পিটার ম্যান্ডেলসন। এপস্টেইনের সঙ্গে ম্যান্ডেলসনের সখ্যের কথা পুরনো হলেও, নতুন ফাঁস হওয়া নথি বলছে ২০০৮ সালের বিশ্বমন্দার সময় তিনি রাষ্ট্রীয় গোপন তথ্য এপস্টেইনকে পাচার করেছিলেন।
এই অভিযোগের জেরে ম্যান্ডেলসন হাউস অব লর্ডস ও লেবার পার্টি থেকে পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছেন। পার্লামেন্টে প্রধানমন্ত্রী স্টারমারকে এই নিয়োগের বিষয়ে চরম হেনস্তার শিকার হতে হয়েছে। নিজের অবস্থান পরিষ্কার করতে গিয়ে তিনি অনেকটা অসহায়ভাবে স্বীকার করেছেন যে, সম্পর্কের গভীরতা তাঁর জানা ছিল না।
যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক পরিস্থিতির তুলনামূলক চিত্র:
| সূচক (Criteria) | যুক্তরাজ্য (কিয়ার স্টারমার) | যুক্তরাষ্ট্র (ডোনাল্ড ট্রাম্প) |
| জবাবদিহিতার ধরণ | পার্লামেন্টে সরাসরি প্রশ্নোত্তর ও জবাবদিহি। | দলীয় নিয়ন্ত্রণে থাকা কংগ্রেস ও বিচার বিভাগ। |
| নেতৃত্বের ঝুঁকি | দলীয় বিদ্রোহ ও অনাস্থা প্রস্তাবের উচ্চ ঝুঁকি। | প্রেসিডেন্সিয়াল মেয়াদের সুরক্ষা ও অসীম ক্ষমতা। |
| তদন্তের প্রকৃতি | স্বাধীন ও কঠোর ফৌজদারি তদন্তের সক্রিয়তা। | রাজনৈতিক প্রভাবে তদন্ত ধামাচাপা পড়ার প্রবণতা। |
| জনমত ও প্রভাব | এপস্টেইন ইস্যুতে রাজপরিবারসহ পুরো রাষ্ট্র টালমাটাল। | কেলেঙ্কারি সত্ত্বেও ট্রাম্পের জনভিত্তি অটুট। |
ওয়াশিংটনে প্রকাশিত নথির ধাক্কায় লন্ডনের রাজনীতি লন্ডভন্ড হওয়ার পেছনে মূলত তিনটি কারণ কাজ করছে:
১. স্টারমারের নেতৃত্বের দুর্বলতা: নির্বাচনে বিশাল জয়ের দুই বছর পার না হতেই স্টারমারের নেতৃত্ব নিয়ে দলের ভেতর গুঞ্জন শুরু হয়েছে। পার্লামেন্টে তাঁর ‘অসহায়’ আত্মসমর্পণ লেবার পার্টির এমপিদের মধ্যে বিদ্রোহের আগুন উসকে দিয়েছে।
২. পিটার ম্যান্ডেলসনের পতন: যাকে একসময় ‘প্রিন্স অব ডার্কনেস’ বলা হতো, সেই ম্যান্ডেলসনের রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের অবসান ব্রিটিশ রাজনীতির একটি বড় অধ্যায়ের পরিসমাপ্তি ঘটিয়েছে। ধনকুবেরদের সংস্পর্শে থাকার লোভই তাঁর কাল হয়েছে।
৩. রাজপরিবারের ভাবমূর্তি: এপস্টেইন-কাণ্ডে প্রিন্স অ্যান্ড্রুর নাম নতুন করে জড়ানোয় ব্রিটিশ রাজপরিবার এখন এক অস্তিত্ব সংকটের মুখে পড়েছে।
যুক্তরাজ্যে যখন একের পর এক প্রভাবশালী ব্যক্তি মাটিতে মিশে যাচ্ছেন, ট্রাম্প তখন প্রায় ধরাছোঁয়ার বাইরে। রিপাবলিকান নিয়ন্ত্রিত কংগ্রেস এবং অনুগত বিচার বিভাগের কারণে ট্রাম্পকে কোনো কঠিন জেরার মুখে পড়তে হচ্ছে না। এমনকি ক্লিনটন দম্পতির সাক্ষ্য দেওয়ার বিষয়ে তিনি যে ‘সহমর্মিতা’ দেখিয়েছেন, তা মূলত রাজনৈতিক কৌশল ছাড়া আর কিছুই নয়। এতে পরিষ্কার যে, যুক্তরাষ্ট্রে ক্ষমতার দাপটে এপস্টেইন-কাণ্ডের বিচার অনেকটা গতিহীন হয়ে পড়ছে।
এপস্টেইন নথির বিষাক্ত প্রভাব এখন নরওয়ে থেকে পোল্যান্ড পর্যন্ত বিস্তৃত। সাত বছর আগে এপস্টেইনের মৃত্যু হলেও তাঁর তৈরি করা অন্ধকার জগতের রহস্যগুলো আজও বিশ্বনেতাদের গদি নাড়িয়ে দিচ্ছে। কিয়ার স্টারমার এখন কতদিন টিকবেন, সেটিই এখন ব্রিটিশ রাজনীতির বড় প্রশ্ন। গত ১১ বছরে পাঁচজন প্রধানমন্ত্রী বদলানো যুক্তরাজ্য কি আরও একবার নতুন নেতৃত্বের সন্ধানে নামবে? সময় ও তদন্তের গতিই বলে দেবে স্টারমারের রাজনৈতিক ভাগ্যে কী লেখা আছে।