বাংলাদেশে করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা (সিএসআর) তহবিলের ব্যবহার, স্বচ্ছতা ও অগ্রাধিকার নির্ধারণকে ঘিরে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর সিএসআর তহবিল থেকে পুলিশের পরিচালনাধীন একটি বিদ্যালয় নির্মাণে অর্থায়নের প্রস্তাব এই আলোচনা আবারও সামনে এনেছে। সংশ্লিষ্ট মহলে এটি ‘নির্দেশিত সিএসআর’ কি না এবং স্বেচ্ছাসেবী দানের সঙ্গে প্রাতিষ্ঠানিক চাপের সীমারেখা কোথায়—তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
এই বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকস (বিএবি)। সংগঠনটি সাম্প্রতিক সময়ে ২০টি বাণিজ্যিক ব্যাংকের কাছে তাদের নিজ নিজ সিএসআর বাজেট থেকে পাঁচ কোটি টাকা করে অনুদান দেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছে। এর মাধ্যমে প্রায় ১০০ কোটি টাকা সংগ্রহের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। বিএবি সূত্রে জানা গেছে, ঢাকার মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) সদর দপ্তরের একটি আনুষ্ঠানিক প্রস্তাবের পরিপ্রেক্ষিতেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
প্রস্তাবে রাজধানীর ডেমরা পুলিশ লাইন্স এলাকায় আটতলা একটি স্কুল ভবন নির্মাণের পরিকল্পনার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। বিদ্যালয়টি মূলত পুলিশ সদস্যদের সন্তানদের জন্য হলেও আশপাশের এলাকার শিক্ষার্থীরাও ভর্তির সুযোগ পাবে বলে জানানো হয়েছে। ভবন নির্মাণ, আসবাবপত্র ও শিক্ষা উপকরণ মিলিয়ে প্রকল্পটির আনুমানিক ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ১০০ কোটি টাকা। ডিএমপি কর্তৃপক্ষের যুক্তি হলো, প্রকল্পটি সরকারের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে অন্তর্ভুক্ত নয় এবং পুলিশের নিজস্ব তহবিলেও পর্যাপ্ত অর্থ নেই; ফলে বেসরকারি খাতের সহায়তা অপরিহার্য।
গত ১ ফেব্রুয়ারি নির্বাচিত কয়েকটি ব্যাংকের কাছে বিএবি আনুষ্ঠানিক চিঠি পাঠায়। যদিও ব্যাংকগুলোর নাম প্রকাশ করা হয়নি, তবে আর্থিকভাবে শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানগুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। এই স্কুল প্রকল্পটি ডেমরা পুলিশ লাইন্সের সামগ্রিক অবকাঠামো সম্প্রসারণের অংশ। সেখানে ইতোমধ্যে ৩৬ দশমিক ৬৬ একর জমিতে ২০ তলা একটি আবাসিক ভবন নির্মাণ করা হয়েছে, যেখানে প্রায় ৩০০ পুলিশ পরিবার বসবাস করছে। কর্তৃপক্ষের মতে, স্কুলটি ওই আবাসিক কমপ্লেক্সের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং বৃহত্তর সামাজিক কল্যাণেও ভূমিকা রাখবে।
তবে ব্যাংক খাতে অস্বস্তি স্পষ্ট। একাধিক ব্যবস্থাপনা পরিচালক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেছেন, শিল্পসংগঠনের মাধ্যমে এ ধরনের অনুরোধ কার্যত চাপের শামিল। তাঁদের মতে, সিএসআর-এর মূল দর্শন স্বেচ্ছাসেবিতা; কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিক ‘পরামর্শ’ এলে সেই স্বেচ্ছাচারিতা ক্ষুণ্ন হয়।
এই উদ্বেগ প্রকাশ্যে এনেছেন সিটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এবং অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স, বাংলাদেশের চেয়ারম্যান মাশরুর আরেফিন। তিনি অতীতে ‘নির্দেশিত সিএসআর’-এর কারণে ব্যাংক কর্মকর্তাদের দুর্নীতি দমন কমিশনের জিজ্ঞাসাবাদের মুখোমুখি হওয়ার উদাহরণ তুলে ধরে বলেন, সিএসআর ব্যয় অবশ্যই স্বচ্ছ, স্বেচ্ছাসেবী এবং নিয়ন্ত্রক নীতিমালার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সিএসআর নীতিমালায় শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর আয়বর্ধক কার্যক্রমকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, শিক্ষা খাতে বিনিয়োগ বৈধ সিএসআর ক্ষেত্র হলেও স্বাস্থ্যসেবায় বিনিয়োগ অনেক ক্ষেত্রে দ্রুত ও ব্যাপক সামাজিক সুফল আনে।
সব মিলিয়ে এই প্রস্তাব এখন সিএসআর তহবিল ব্যবস্থাপনার নৈতিকতা, প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতা ও জবাবদিহি নিয়ে জাতীয় পর্যায়ের আলোচনার সূচক হয়ে উঠেছে।
| প্রকল্পের সারসংক্ষেপ | বিবরণ |
|---|---|
| প্রকল্পের ধরন | পুলিশ পরিচালিত বিদ্যালয় |
| অবস্থান | ডেমরা পুলিশ লাইন্স, ঢাকা |
| ভবনের উচ্চতা | আট তলা |
| আনুমানিক ব্যয় | প্রায় ১০০ কোটি টাকা |
| অর্থায়নের উৎস | ব্যাংকের সিএসআর তহবিল |
| উপকারভোগী | পুলিশ সদস্যদের সন্তান ও স্থানীয় শিক্ষার্থী |
বর্ধিত নজরদারির মধ্যে এই উদ্যোগটি ভবিষ্যতে সিএসআর তহবিল কীভাবে সংগ্রহ ও ব্যয় করা হবে—সে বিষয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারে।