খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
রাজবাড়ী প্রতিনিধি: আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে এখন সারা দেশের নজর রাজবাড়ী-১ (সদর ও গোয়ালন্দ) আসনের দিকে। বিশেষ করে ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ২০২৬ সালের এই নির্বাচনকে ঘিরে স্থানীয় ও জাতীয় রাজনীতিতে বইছে নতুন মেরুকরণের হাওয়া। সোমবার বিকেলে রাজবাড়ীর শহীদ খুশি রেলওয়ে ময়দানে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) মনোনীত প্রার্থী ও সাবেক সংসদ সদস্য আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়মের শেষ নির্বাচনী গণসমাবেশটি এক বিশাল জনসমুদ্রে পরিণত হয়, যা রাজবাড়ীর রাজনৈতিক ইতিহাসে এক স্মরণীয় অধ্যায় হয়ে থাকবে।
সমাবেশে বক্তব্য প্রদানকালে সাবেক সংসদ সদস্য আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়ম অত্যন্ত আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন। ভারাক্রান্ত কণ্ঠে তিনি তার শৈশব ও কৈশোরের স্মৃতিচারণ করে বলেন, “রাজনীতি আমার পেশা নয়, এটি আমার জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। আমার যৌবন কেটেছে এই রাজবাড়ীর রিকশাচালক, কামার, কুমোর, জেলে ও মেহনতি মানুষের পাশে থেকে। আমি কোনোদিন দুর্নীতির পথে হাঁটিনি, কারো অনিষ্ট করিনি। আমি চলে যাবো, কিন্তু আমার কর্মের মধ্য দিয়ে আপনাদের হৃদয়ে বেঁচে থাকতে চাই।”
তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, তার এবারের লড়াই কেবল ক্ষমতার জন্য নয়, বরং রাজবাড়ীর মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের জন্য। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার আদর্শকে ধারণ করে এবং তারেক রহমানের নেতৃত্বে একটি সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে তিনি ‘ধানের শীষ’ প্রতীকে ভোট প্রার্থনা করেন।
রাজবাড়ী-১ আসনটি বরাবরই রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত স্পর্শকাতর। এই আসনের নির্বাচনী সমীকরণ কেবল আঞ্চলিক নয়, বরং জাতীয় রাজনীতির অনেক অমীমাংসিত প্রশ্নের উত্তর দেয়। বিশেষ করে পদ্মা ব্যারেজ ও দ্বিতীয় পদ্মা সেতু বাস্তবায়নের দাবিতে খৈয়মের দীর্ঘদিনের আন্দোলন তাকে সাধারণ মানুষের কাছে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে। বর্তমানে তিনি ‘পদ্মা ব্যারেজ ও দ্বিতীয় পদ্মা সেতু বাস্তবায়ন জাতীয় কমিটি’র আহ্বায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন, যা এবারের নির্বাচনে বিএনপির অন্যতম প্রধান নির্বাচনী ইশতেহার হিসেবে গণ্য হচ্ছে।
নিচে রাজবাড়ী-১ আসনের প্রধান প্রার্থীদের সংক্ষিপ্ত তালিকা ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট তুলে ধরা হলো:
| প্রার্থীর নাম | রাজনৈতিক দল | প্রধান নির্বাচনী ইস্যু | অভিজ্ঞতা |
| আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়ম | বিএনপি | পদ্মা ব্যারেজ, দ্বিতীয় পদ্মা সেতু, বেকারত্ব দূরীকরণ ও নদী শাসন। | ৩ বার পৌর চেয়ারম্যান/মেয়র ও সাবেক সংসদ সদস্য। |
| অ্যাডভোকেট মো. নূরুল ইসলাম | জামায়াতে ইসলামী | ইনসাফ কায়েম ও নৈতিক সমাজ গঠন। | জামায়াতে ইসলামীর জেলা আমির। |
| অন্যান্য প্রার্থী | জাতীয় পার্টি ও স্বতন্ত্র | স্থানীয় উন্নয়ন ও অবকাঠামো সংস্কার। | বিভিন্ন সাংগঠনিক স্তরের নেতা। |
আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়মের রাজনৈতিক জীবন শুরু হয় তৃণমূল থেকে। তিনি টানা তিনবার রাজবাড়ী পৌরসভার চেয়ারম্যান ও মেয়র নির্বাচিত হয়ে এক বিরল রেকর্ড গড়েন। তার সময়েই রাজবাড়ী শহরের রাস্তাঘাট, আধুনিক ড্রেনেজ ব্যবস্থা ও স্যানিটেশন ব্যবস্থার ব্যাপক উন্নতি ঘটে, যার ফলে তাকে ‘আধুনিক রাজবাড়ীর রূপকার’ হিসেবে অভিহিত করা হয়। ২০০১ সালে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর তিনি গোয়ালন্দ ও সদর উপজেলার শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়নে অভূতপূর্ব ভূমিকা রাখেন।
বিশ্লেষকদের মতে, ২০২৬ সালের এই নির্বাচনে রাজবাড়ী-১ আসনে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর মধ্যে। যদিও ২০২৪ সালের পর রাজনীতির মাঠে অনেক পরিবর্তন এসেছে, তবুও খৈয়মের ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা এবং তার উন্নয়নমুখী কর্মকাণ্ড তাকে অনেকটা সুবিধাজনক অবস্থানে রেখেছে। তবে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক প্রতিকূলতা ও কারাবরণের পর দলীয় ঐক্য ধরে রেখে জয় নিশ্চিত করাই হবে তার মূল চ্যালেঞ্জ।
পদ্মা নদীর ভাঙন রোধ এবং দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া রুটের আধুনিকায়ন রাজবাড়ীবাসীর দীর্ঘদিনের দাবি। আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়ম এই দাবিগুলোকে তার নির্বাচনী ইশতেহারের শীর্ষে রেখেছেন। শেষ পর্যন্ত রাজবাড়ীর সাধারণ ভোটাররা তাদের চিরচেনা এই নেতার ওপর পুনরায় আস্থা রাখেন কি না, তা দেখার অপেক্ষায় এখন পুরো দেশ।