খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: বুধবার, ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
আসন্ন সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বন্দরনগরী চট্টগ্রামসহ জেলার ১৬টি সংসদীয় আসনে নির্বাচনী প্রস্তুতি এখন শেষ পর্যায়ে। তবে সরেজমিনে বিভিন্ন ভোটকেন্দ্র পরিদর্শন করে নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং অবকাঠামোগত প্রস্তুতির ক্ষেত্রে মিশ্র চিত্র ফুটে উঠেছে। বিশেষ করে বিশাল সংখ্যক ভোটকেন্দ্রকে ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ হিসেবে চিহ্নিত করা হলেও অনেক কেন্দ্রে সিসিটিভি ক্যামেরার অনুপস্থিতি এবং প্রয়োজনীয় বুথ বা কক্ষ সংকটের বিষয়টি জনমনে শঙ্কার সৃষ্টি করেছে।
চট্টগ্রাম জেলার ১৬টি সংসদীয় আসনে মোট ১ হাজার ৯৬৫টি ভোটকেন্দ্র রয়েছে। এর মধ্যে ১ হাজার ২৯১টি কেন্দ্রকেই ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ বা ‘অধিক গুরুত্বপূর্ণ’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, নগর এলাকায় ৩১২টি এবং জেলার উপজেলা পর্যায়ে ৩৪৪টি কেন্দ্র অতিঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে।
ভোটকেন্দ্রের ভৌগোলিক অবস্থান, অতীতের সংঘাতের ইতিহাস এবং রাজনৈতিক মেরুকরণ বিবেচনা করে কেন্দ্রগুলোকে তিনটি শ্রেণিতে ভাগ করা হয়েছে। চট্টগ্রাম জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ডিবি ও শিল্পাঞ্চল) রাসেল জানান, ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রগুলোতে নির্বাচন কমিশনের নির্ধারিত ফোর্সের পাশাপাশি অতিরিক্ত নিরাপত্তা বলয় থাকবে। ইতিমধ্যে জেলায় ৯৯৯টি সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন।
চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকার ভোটকেন্দ্রের প্রস্তুতির সংক্ষিপ্ত সারণি নিচে তুলে ধরা হলো:
| এলাকার নাম | কেন্দ্রের অবস্থা ও বিশেষ পর্যবেক্ষণ | সিসিটিভি ও নিরাপত্তা চিত্র |
| চট্টগ্রাম নগর | মডার্ন আইডিয়াল স্কুল: যাতায়াতের পথ অত্যন্ত সরু। | সিসি ক্যামেরা লাগানো হয়েছে। |
| লোহাগাড়া | তৈয়ব আশরাফ স্কুল: কেন্দ্র দখলের অতীত রেকর্ড আছে। | প্রস্তুতির অভাব, সিসি ক্যামেরা নেই। |
| আনোয়ারা | দক্ষিণ গহিরা ও জুঁইদণ্ডী: অগ্নিকাণ্ড ও ব্যালট পোড়ানোর ইতিহাস। | ২৬টি কেন্দ্রে সিসি ক্যামেরা স্থাপন। |
| সন্দ্বীপ | মগধরা ইউনিয়ন: অধিক ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত। | সিসি ক্যামেরা থাকলেও পুলিশ ছিল না। |
| সীতাকুণ্ড | আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয় ও ডিগ্রি কলেজ। | পর্যাপ্ত সিসি ক্যামেরা ও পুলিশ উপস্থিত। |
| কর্ণফুলী | পশ্চিম চরপাথরঘাটা স্কুল: সীমানা প্রাচীর নেই। | সম্পূর্ণ ভবন সিসি ক্যামেরার আওতাভুক্ত। |
অবকাঠামো ও বুথ সংকট: লোহাগাড়া উপজেলার তৈয়ব আশরাফ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে গিয়ে দেখা যায়, ভোটের মাত্র একদিন বাকি থাকলেও প্রস্তুতি ছিল যৎসামান্য। বুথ তৈরির জন্য পর্যাপ্ত কক্ষ না থাকায় কাপড় দিয়ে অস্থায়ী বুথ তৈরির পরিকল্পনা করা হয়েছে। আবার ভবানীপুর এলাকার একটি কেন্দ্র জরাজীর্ণ ভবনে হওয়ায় সেখানে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ভোট দিতে হবে ভোটারদের।
সিসিটিভি ও নজরদারি: আনোয়ারা ও সীতাকুণ্ডের মতো এলাকাগুলোতে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করা হলেও লোহাগাড়ার অতিঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রে এর অনুপস্থিতি বিস্ময়কর। সীতাকুণ্ড মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জানান, তাদের ১০৮টি কেন্দ্রের সবকটিই গুরুত্বপূর্ণ, যার মধ্যে ৪৮টি অতিগুরুত্বপূর্ণ। অথচ অনেক কেন্দ্রে ভোটারদের সারি করার জন্য সাধারণ বাঁশ বা নিরাপত্তা বেষ্টনী পর্যন্ত তৈরি করা হয়নি।
দুর্গম ও উপকূলীয় অঞ্চলের ঝুঁকি: সন্দ্বীপ ও আনোয়ারার উপকূলীয় কেন্দ্রগুলো ভৌগোলিক কারণেই দুর্গম। এসব জায়গায় প্রশাসনিক উপস্থিতি কম থাকার সুযোগে অতীতে কেন্দ্র দখল ও প্রভাব বিস্তারের ঘটনা ঘটেছে। আনোয়ারার দক্ষিণ জুঁইদণ্ডী কেন্দ্রে গত নির্বাচনে ব্যালট বাক্স পুড়িয়ে দেওয়ার মতো সহিংস ঘটনা ঘটলেও এবারও সেখানে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ কাটেনি।
প্রশাসনের পক্ষ থেকে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থার কথা বলা হলেও মাঠপর্যায়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের দৃশ্যমান উপস্থিতি অনেক কেন্দ্রে কম দেখা গেছে। মিরসরাইয়ের বড়তাকিয়া যাহেদিয়া দাখিল মাদ্রাসায় গিয়ে দেখা যায়, প্রিসাইডিং কর্মকর্তা একাই কোথায় কীভাবে বুথ স্থাপন করবেন তা নিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন। রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সংঘাতের আশঙ্কায় ভোটারদের মধ্যে এক ধরনের চাপা উদ্বেগ কাজ করছে।
পরিশেষে বলা যায়, একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য কেবল সিসিটিভি ক্যামেরাই যথেষ্ট নয়, বরং কেন্দ্রগুলোতে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা বাহিনী, সীমানা প্রাচীর এবং ভোটারদের স্বাচ্ছন্দ্যে ভোট দেওয়ার মতো পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি। প্রশাসনের দাবি অনুযায়ী যদি দ্রুততম সময়ের মধ্যে বাকি কেন্দ্রগুলোতে সিসি ক্যামেরা ও অস্থায়ী বুথ স্থাপন করা না হয়, তবে ভোটগ্রহণের দিন বিশৃঙ্খলা এড়ানো কঠিন হয়ে পড়তে পারে।