খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: সোমবার, ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের কাশিমপুর এলাকায় জনমানুষের দীর্ঘদিনের প্রতীক্ষিত একটি সড়ক উদ্বোধনের আগেই ধসে পড়ার ঘটনা ঘটেছে। তুরাগ নদের পাড়ঘেঁষা এই নবনির্মিত সড়কটি যান চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করার আগেই বড় ধরনের ভাঙনের কবলে পড়ায় স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে চরম ক্ষোভ, হতাশা ও উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ করে তড়িঘড়ি করে নির্মাণকাজ শেষ করা এবং নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহারের অভিযোগ তুলেছেন এলাকাবাসী।
কাশিমপুরের ধনঞ্জয়খালী এলাকায় তুরাগ নদের তীর ঘেষে এই সড়কটি নির্মাণ করা হয়েছিল। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, সিটি নির্বাচনের ঠিক আগ মুহূর্তে অত্যন্ত দ্রুতগতিতে রাস্তার ঢালাই ও বিটুমিনাস কার্পেটিংয়ের কাজ শেষ করা হয়। কিন্তু ঢালাই শেষ হওয়ার মাত্র তিন দিনের মাথায় সড়কের একটি অংশে ভয়াবহ ফাটল দেখা দেয়। এর কিছুদিনের মধ্যেই বিশাল একটি অংশ কয়েক ফুট নিচে দেবে গিয়ে তুরাগ নদে বিলীন হওয়ার উপক্রম হয়। বর্তমানে সড়কের বিভিন্ন স্থানে ছোট-বড় অসংখ্য ফাটল দৃশ্যমান, যা পুরো কাঠামোটিকে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে।
সিটি কর্পোরেশন সূত্রে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, কাশিমপুর জোনে তুরাগ নদের পশ্চিম তীরে সড়ক উন্নয়নের জন্য দুটি পৃথক প্যাকেজে প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছিল। এই কাজ বাস্তবায়নের দায়িত্ব পায় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ইউনাইটেড কমার্শিয়াল সেন্টার লিমিটেড (ইউসিসিএল)। বিস্ময়কর বিষয় হলো, উভয় প্যাকেজেই প্রাক্কলিত ব্যয়ের চেয়ে অনেক বেশি মূল্যে কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছে।
নিচে প্রকল্প দুটির সংক্ষিপ্ত পরিসংখ্যান তুলে ধরা হলো:
| প্রকল্পের বিবরণ | প্রাক্কলিত ব্যয় (টাকা) | কার্যাদেশের মূল্য (টাকা) | অতিরিক্ত ব্যয় (টাকা) |
| প্যাকেজ-১: ১১৫০ মিটার সড়ক নির্মাণ | ১০ কোটি ৮০ লাখ | ১১ কোটি ৬৪ লাখ ৪১ হাজার ৫৭১ | ৮৪ লাখ ৪১ হাজার ৫৭১ |
| প্যাকেজ-২: ১২০৪৬ মিটার সড়ক নির্মাণ | ১৩ কোটি ১৯ লাখ ২১ হাজার | ১৪ কোটি ২৮ লাখ ১১ হাজার ৪৫৯ | ১ কোটি ৮ লাখ ৯০ হাজার ৪৫৯ |
| মোট | ২৩ কোটি ৯৯ লাখ ২১ হাজার | ২৫ কোটি ৯২ লাখ ৫৩ হাজার ৩০ | ১ কোটি ৯৩ লাখ ৩২ হাজার ৩০ |
এই প্রকল্পের আওতায় মূলত ২৫০ মিটার ডব্লিউবিএম (WBM), ৬০ মিলিমিটার কার্পেটিং, ১.৮ মিটার ফুটপাত, রেলিং এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গার্ডওয়াল নির্মাণের কথা ছিল।
সড়ক ধসে পড়ার ঘটনায় নড়েচড়ে বসেছে সিটি কর্পোরেশন কর্তৃপক্ষ। কাশিমপুর জোনের নির্বাহী প্রকৌশলী শামসুর রহমান জানান, সড়কটি নদের একদম পাড়ঘেঁষা হওয়ায় মাটির গঠন বা প্রাকৃতিক কারণেও এমনটি হতে পারে। তবে পরিকল্পনায় কোনো বড় ধরনের ত্রুটি ছিল কি না, তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
অন্যদিকে, গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ও প্রকল্প পরিচালক এ কে এম হারুনুর রশীদ জানিয়েছেন, এই ধসের প্রকৃত কারণ উদঘাটনে একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করা হচ্ছে। এই কমিটির প্রধান হিসেবে থাকবেন ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (ডুয়েট) একজন বিশেষজ্ঞ শিক্ষক। তিনি আশ্বাস দিয়েছেন যে, যদি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের গাফিলতি বা নির্মাণে নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহারের প্রমাণ পাওয়া যায়, তবে আইনানুগ কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
স্থানীয় বাসিন্দা রুহুল আমিনের মতে, “আমরা বছরের পর বছর এই রাস্তার জন্য অপেক্ষা করেছি। কিন্তু উদ্বোধনের আগেই যদি রাস্তা এভাবে ভেঙে যায়, তবে এর স্থায়িত্ব নিয়ে আমাদের মনে গভীর সন্দেহ জাগে।” এলাকাবাসীর অভিযোগ, কার্যাদেশ প্রদানের ক্ষেত্রে অস্বচ্ছতা এবং তড়িঘড়ি করে কাজ শেষ করার প্রবণতাই এই বিপর্যয়ের মূল কারণ। তারা কেবল তদন্ত কমিটি গঠন নয়, বরং স্বচ্ছ তদন্তের মাধ্যমে দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি এবং দ্রুত সড়কটি সংস্কারের দাবি জানিয়েছেন।
ঘটনাটি নিয়ে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ইউসিসিএল-এর পরিচালক জাহিদুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার পক্ষ থেকে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। ফলে জনমনে সন্দেহ আরও ঘনীভূত হচ্ছে। এখন দেখার বিষয়, ডুয়েটের বিশেষজ্ঞ সংবলিত তদন্ত কমিটি এই ধসের পেছনে কারিগরি ত্রুটি নাকি দুর্নীতির ছায়া খুঁজে পায়।