খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: সোমবার, ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার অন্যতম প্রধান অন্তরায় হিসেবে দেখা দিয়েছে লাগামহীন মূল্যস্ফীতি। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাম্প্রতিক এক গবেষণা প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এক উদ্বেগজনক চিত্র—সাধারণ মানুষের মজুরি যে হারে বাড়ছে, তার চেয়ে ঢের বেশি গতিতে বাড়ছে নিত্যপণ্যের দাম। ফলে আয়ের সাথে ব্যয়ের সঙ্গতি রাখতে হিমশিম খাচ্ছে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো। রোববার (১৫ ফেব্রুয়ারি) প্রকাশিত বাংলাদেশ ব্যাংকের এই প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাজার ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা না ফেরানো পর্যন্ত এই সংকট থেকে উত্তরণ সম্ভব নয়।
প্রতিবেদনের তথ্যমতে, জুলাই-সেপ্টেম্বর প্রান্তিকের তুলনায় অক্টোবর-ডিসেম্বর প্রান্তিকে মূল্যস্ফীতির চাপ আরও ঘনীভূত হয়েছে। গত বছরের ডিসেম্বর মাসে সাধারণ মূল্যস্ফীতির হার ছিল ৮.৫ শতাংশ, যেখানে মজুরি বৃদ্ধির হার ছিল ৮.১ শতাংশের নিচে। অর্থাৎ, মানুষের প্রকৃত আয় বাড়ার পরিবর্তে কার্যত কমেছে। মজুরি বৃদ্ধির হার মন্থর হয়ে পড়ায় পারিবারিক ক্রয়ক্ষমতা সরাসরি হ্রাস পেয়েছে। জানুয়ারি মাসেও এই প্রবণতা অব্যাহত ছিল এবং মূল্যস্ফীতির হার সামান্য বেড়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
নিচে গত কয়েক মাসের মূল্যস্ফীতি ও মজুরি বৃদ্ধির হারের একটি তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরা হলো:
টেবিল: মূল্যস্ফীতি বনাম মজুরি বৃদ্ধির হারের তুলনামূলক চিত্র
| মাস (২০২৫-২৬) | মূল্যস্ফীতির হার (%) | মজুরি বৃদ্ধির হার (%) | ব্যবধান (পয়েন্ট) |
| জুলাই | – | ৮.১৯ | – |
| সেপ্টেম্বর | – | ৮.১০ (প্রায়) | – |
| অক্টোবর | ৮.১৭ | ৮.০০ | ০.১৭ |
| ডিসেম্বর | ৮.৫০ | ৮.০৭ | ০.৪৩ |
| জানুয়ারি | ৮.৫৬ (সামান্য বৃদ্ধি) | ৮.০৭ (অপরিবর্তিত) | ০.৪৯ |
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গবেষণায় দেখা গেছে, পাইকারি ও খুচরা পর্যায়ের মূল্যের মধ্যে আকাশ-পাতাল ব্যবধান বিদ্যমান। অনেক ক্ষেত্রে বাজারে পণ্যের পর্যাপ্ত সরবরাহ থাকলেও মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য এবং তদারকির অভাবে খুচরা পর্যায়ে দাম কমছে না। ফলে সরকারের নেওয়া বিভিন্ন সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি সত্ত্বেও মূল্যস্ফীতি প্রত্যাশিত পর্যায়ে নেমে আসছে না। বিশেষ করে খাদ্য মূল্যস্ফীতি সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাসের প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং মানুষের জীবনযাত্রার মান স্থিতিশীল রাখতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ করেছে:
বাজার মনিটরিং: পাইকারি ও খুচরা বাজারের দামের ব্যবধান কমাতে নিয়মিত বাজার তদারকি এবং অসাধু ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ।
টেকসই নীতি গ্রহণ: পারিবারিক ক্রয়ক্ষমতা পুনরুদ্ধারে দীর্ঘমেয়াদী এবং টেকসই অর্থনৈতিক নীতি গ্রহণ করা অপরিহার্য।
খাদ্য নিরাপত্তা: খাদ্যপণ্যের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করতে আমদানির পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ উৎপাদন বৃদ্ধিতে জোর দেওয়া।
অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতি: সামষ্টিক অর্থনৈতিক পরিবেশ স্থিতিশীল রাখতে উৎপাদনশীল খাতে ঋণ প্রবাহ সচল রাখা।
প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছে যে, প্রকৃত মজুরি বৃদ্ধির হার যদি মূল্যস্ফীতির নিচে অবস্থান করে, তবে দীর্ঘমেয়াদে দারিদ্র্য বিমোচন কর্মসূচি বাধাগ্রস্ত হতে পারে। তাই মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কেবল মুদ্রানীতির ওপর নির্ভর না করে সরকারের রাজস্ব নীতি ও বাজার ব্যবস্থাপনার সমন্বিত হস্তক্ষেপ প্রয়োজন। একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও স্থিতিশীল সামষ্টিক অর্থনৈতিক পরিবেশ নিশ্চিত করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।