খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত নির্বাচনের পর আজ ১৭ ফেব্রুয়ারি শপথ নিতে যাচ্ছে বিএনপি নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার। দীর্ঘ রাজনৈতিক টানাপোড়েন ও অন্তর্বর্তীকালীন শাসনকাল শেষে এই সরকারের সামনে এখন পাহাড়সম প্রত্যাশা। তবে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণের শুরুতেই নতুন মন্ত্রিসভাকে মোকাবিলা করতে হবে এক ভয়াবহ অর্থনৈতিক বাস্তবতার। বিশেষ করে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের ভঙ্গুর দশা এবং বিপুল বকেয়া ঋণের বোঝা আগামী পাঁচ বছরের জন্য এই সরকারের সবচেয়ে বড় অগ্নিপরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ সময় থেকে বিদ্যুৎ খাতে বকেয়ার যে পাহাড় জমতে শুরু করেছিল, তা বর্তমানে নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। সরকারি ও বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর (আইপিপি) পাওনা পরিশোধ করা এখন নতুন সরকারের প্রধান মাথাব্যথা। বাংলাদেশ ইন্ডিপেনডেন্ট পাওয়ার প্রডিউসারস অ্যাসোসিয়েশন (বিপ্পা)-এর তথ্যমতে, তাদের বকেয়ার পরিমাণ বর্তমানে প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকা। নিরবচ্ছিন্ন উৎপাদন সচল রাখতে তারা দ্রুত অন্তত ৬০ শতাংশ বা ৮ হাজার ৪০০ কোটি টাকা পরিশোধের দাবি জানিয়েছে। এর বাইরে ভারতের আদানি পাওয়ারের বকেয়া ১০০ কোটি ডলার ছাড়িয়ে গেছে, যা বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করছে।
নিচে বিদ্যুৎ খাতের আর্থিক সংকটের একটি তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরা হলো:
| সূচক | ২০১১-২০১৫ সময়কাল | ২০২৪-২০২৬ সময়কাল | পরিবর্তনের হার |
| পিডিবির বার্ষিক লোকসান | ৫,৫০০ কোটি টাকা | ৫০,০০০ কোটি টাকা (প্রায়) | ৯ গুণের বেশি বৃদ্ধি |
| বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা | – | ৪ গুণ বৃদ্ধি | – |
| বেসরকারি কেন্দ্রকে পরিশোধ | – | ১১ গুণ বৃদ্ধি | উদ্বেগজনক |
| ক্যাপাসিটি পেমেন্ট | – | ২০ গুণ বৃদ্ধি | চরম আশঙ্কাজনক |
জ্বালানি খাতেও চিত্রটি সমানভাবে হতাশাজনক। পেট্রোবাংলার হিসাব অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে প্রতিদিন গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩,৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট, যার বিপরীতে সরবরাহ মিলছে মাত্র ২,৯০০ মিলিয়ন ঘনফুট। এই ৯০০ মিলিয়ন ঘনফুটের বিশাল ঘাটতি শিল্পোৎপাদন ও বিদ্যুৎ উৎপাদনকে ব্যাহত করছে। ২০৩১ সাল পর্যন্ত সরকারের এই মেয়াদে গ্যাসের চাহিদা ৪,০০০ মিলিয়ন ঘনফুট ছাড়িয়ে যাবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকার কর্তৃক দুটি এলএনজি টার্মিনাল বাতিল করার ফলে ভবিষ্যতে গ্যাস আমদানির সক্ষমতাও সীমিত হয়ে পড়েছে। এর ফলে হাতে টাকা থাকলেও পরিকাঠামোর অভাবে গ্যাস সরবরাহ বাড়ানো সম্ভব হবে না। দেশীয় খনিগুলো থেকে উত্তোলন বাড়ানো না গেলে এই সংকট দীর্ঘমেয়াদী রূপ নিতে পারে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ইজাজ হোসেইনের মতে, নতুন সরকারকে ভর্তুকি ব্যবস্থাপনায় কঠোর হতে হবে। তিনি মনে করেন, হঠাৎ ভর্তুকি তুলে না দিয়ে একটি বার্ষিক লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে ধীরে ধীরে তা কমিয়ে আনা উচিত। একইসঙ্গে আমদানিনির্ভরতা কমাতে স্থলভাগ ও সমুদ্রবক্ষে গ্যাস অনুসন্ধানে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসার এবং বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর ‘ক্যাপাসিটি চার্জ’ সংক্রান্ত অসম চুক্তিগুলো পুনর্মূল্যায়ন করাও এই সরকারের জন্য জরুরি।
পরিশেষে, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ এবং শিল্পকারখানা সচল রাখতে হলে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের এই অচলাবস্থা নিরসন করাই হবে নতুন সরকারের প্রথম এবং প্রধান কাজ। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষা করে এই বিশাল আর্থিক ঘাটতি কীভাবে মোকাবিলা করা হয়, তার ওপরই নির্ভর করছে দেশের আগামীর অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ।