খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের পর টানা ১৮ মাস দায়িত্ব পালনকারী অন্তর্বর্তী সরকারের অধ্যায়ের অবসান ঘটিয়ে আজ মঙ্গলবার (১৭ ফেব্রুয়ারি) থেকে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল–এর নেতৃত্বে নতুন রাজনৈতিক সরকারের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হচ্ছে। বিকাল ৪টায় জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় নবগঠিত মন্ত্রিসভা শপথ নেবে। রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন তাঁদের শপথ বাক্য পাঠ করাবেন। এর আগে সকাল ১০টায় প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিন-এর কাছে নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যরা শপথ গ্রহণ করবেন। এর মাধ্যমে দেশ পুনরায় পূর্ণাঙ্গ রাজনৈতিক শাসনব্যবস্থায় প্রত্যাবর্তন করছে বলে জাতীয় সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে।
নতুন সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ অর্থনৈতিক। ২০২৪-২৫ অর্থবছর শেষে দেশি-বিদেশি উৎস থেকে নেওয়া সরকারি ঋণের পরিমাণ ছিল ২২ লাখ ৫০ হাজার ৯০৪ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে ব্যাংকিং খাত ও বৈদেশিক ঋণ বৃদ্ধি পাওয়ায় ডিসেম্বর পর্যন্ত মোট ঋণ দাঁড়িয়েছে ২৩ লাখ ২৫ হাজার ১৫৫ কোটি টাকায়। অর্থাৎ দায়িত্ব গ্রহণের মুহূর্তেই ২৩ লাখ কোটি টাকারও বেশি ঋণের বোঝা কাঁধে নিতে হচ্ছে নতুন সরকারকে।
নিচে ঋণের হালনাগাদ চিত্র তুলে ধরা হলো—
| সময়কাল | মোট সরকারি ঋণ (কোটি টাকা) | উৎসের ধরন |
|---|---|---|
| ২০২৪-২৫ অর্থবছর শেষে | ২২,৫০,৯০৪ | দেশি ও বৈদেশিক |
| চলতি অর্থবছর (ডিসেম্বর পর্যন্ত) | ২৩,২৫,১৫৫ | ব্যাংক ঋণ ও বৈদেশিক সহায়তা |
অর্থনীতিবিদদের মতে, উচ্চ সুদব্যয়, রাজস্ব ঘাটতি এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ—এই তিনটি বিষয় নতুন সরকারের নীতিনির্ধারণে তাৎক্ষণিক প্রভাব ফেলবে।
দলীয় সূত্রে জানা গেছে, নবীন-প্রবীণ ও পেশাগতভাবে দক্ষদের সমন্বয়ে ৩৫ থেকে ৪০ সদস্যের একটি মন্ত্রিসভা গঠিত হতে পারে। এর মধ্যে ২৬ থেকে ২৭ জন পূর্ণমন্ত্রী এবং বাকিরা প্রতিমন্ত্রী ও উপমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পেতে পারেন। তিন প্রজন্মের রাজনৈতিক নেতৃত্বকে একত্র করে প্রযুক্তিনির্ভর ও সংস্কারমুখী প্রশাসন গড়ে তোলার পরিকল্পনার কথা বলা হচ্ছে।
গণভোটে অনুমোদিত দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ ব্যবস্থার প্রেক্ষাপটে উচ্চকক্ষ গঠনের পদ্ধতি এখন আলোচনার কেন্দ্রে। রাজনৈতিক দলগুলোর প্রাপ্ত মোট ভোটের ভিত্তিতে, নাকি নিম্নকক্ষে আসনসংখ্যার অনুপাতে উচ্চকক্ষ গঠন হবে—এ নিয়ে মতপার্থক্য রয়েছে। জুলাই সনদের আইনি ভিত্তি নিয়েও দলগুলোর মধ্যে আলোচনা চলছে।
সরকার গঠনের আগেই প্রশাসনের শীর্ষ পর্যায়ে পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলেছে। মন্ত্রিপরিষদ সচিব শেখ আবদুর রশীদ ও প্রধান উপদেষ্টার মুখ্য সচিব এম সিরাজ উদ্দিন মিয়া স্বেচ্ছায় দায়িত্ব ছেড়েছেন। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব নাসিমুল গনি নতুন মন্ত্রিপরিষদ সচিব হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন। ধারণা করা হচ্ছে, জেলা প্রশাসক ও গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের সচিব পর্যায়েও পরিবর্তন আসতে পারে।
এদিকে চট্টগ্রাম বন্দর এলাকায় রমজানের ভোগ্যপণ্যবাহী প্রায় অর্ধশত জাহাজ খালাসে বিলম্বের খবর পাওয়া গেছে। কর্মবিরতি ও নির্বাচনকালীন ছুটির কারণে চাল, ডাল, চিনি ও তেলসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য সময়মতো ছাড় না হওয়ায় সরবরাহব্যবস্থায় চাপ তৈরি হয়েছে। বাজার নিয়ন্ত্রণ ও সরবরাহ স্থিতিশীল রাখা নতুন সরকারের তাৎক্ষণিক অগ্রাধিকার হবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রায় ৬০ শতাংশ সদস্য পেশায় ব্যবসায়ী। হলফনামা পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ১৩ জন বিলিয়নিয়ারসহ ২৩৬ জন কোটিপতি সংসদে প্রতিনিধিত্ব করতে যাচ্ছেন। ফলে নীতি প্রণয়নে ব্যবসায়ী স্বার্থের প্রভাব কতটা থাকবে—তা নিয়েও আলোচনা চলছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস বিদায়ী ভাষণে একটি ন্যায়সঙ্গত ও জবাবদিহিমূলক বাংলাদেশ গঠনে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁর ভাষায়, গত ১৮ মাসে বাকস্বাধীনতা ও গণতান্ত্রিক চর্চার যে ভিত্তি তৈরি হয়েছে, তা আরও শক্তিশালী করাই এখন নতুন সরকারের দায়িত্ব।
সব মিলিয়ে, বিপুল ঋণের ভার, প্রশাসনিক পুনর্গঠন, উচ্চকক্ষ গঠন বিতর্ক ও বাজার ব্যবস্থাপনার চাপ—এই বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়েই বিএনপি নেতৃত্বাধীন নতুন সরকারের পথচলা শুরু হচ্ছে।