খবরওয়ালা খেলা ডেস্ক
প্রকাশ: সোমবার, ৪ আগস্ট ২০২৫
সংসার চলত খুব কষ্টে, প্রায়ই অভাব লেগে থাকত। এমন এক টানাটানির সংসারের সদস্য ছিলেন হামিদুর রহমান রানা। একসময় গ্রামের মসজিদে মাত্র তিন হাজার টাকা বেতনে ইমামতির চাকরি করতেন। যাতায়াতের জন্য ব্যবহার করতেন একটি সাধারণ বাইসাইকেল। হাতে থাকত স্বল্প দামের একটি মোবাইল ফোন। কিন্তু হঠাৎ করেই পাল্টে যেতে থাকে তাঁর জীবন। বাইসাইকেলের বদলে উঠে পড়েন দামি মোটরসাইকেলে, আর কম দামের ফোনের জায়গায় হাতে চলে আসে লাখ টাকার স্মার্টফোন। এই হঠাৎ পরিবর্তনের পেছনে রয়েছে একটি পদ—‘সমন্বয়ক’।
এই ‘সমন্বয়ক’ পদে থেকেই নিজেকে পাল্টে ফেলেন হামিদুর রহমান রানা। তিনি ছিলেন সদ্য বিলুপ্ত বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ঝিনাইদহ জেলা আহ্বায়ক কমিটির সদস্য ও সমন্বয়ক। বাড়ি ঝিনাইদহের মহেশপুর উপজেলার বলিভদ্রপুর গ্রামে। এখন এলাকায় সবাই তাঁকে চেনে ‘সমন্বয়ক রানা’ নামে। স্থানীয় সূত্রগুলো বলছে, তিনি ছিলেন জেলা কমিটির সদস্যসচিব সাইদুর রহমানের ঘনিষ্ঠ। এই পরিচয়কে ব্যবহার করে মহেশপুর সীমান্তবর্তী এলাকায় একের পর এক অপকর্ম চালিয়ে যাচ্ছেন রানা। অভিযোগ রয়েছে—উপজেলার বিভিন্ন জায়গা থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন, পশুর হাট থেকে নিয়মিত মাসোহারা আদায়, বিভিন্ন প্রকল্পের বরাদ্দ থেকে কমিশন ও চাল নেওয়ার মতো কাজে জড়িয়ে পড়েছেন তিনি।
মহেশপুর পৌরসভার অবকাঠামো উন্নয়নে ১৮ কোটি ৭৩ লাখ টাকার একটি বড় প্রকল্প রয়েছে। সেই কাজের ঠিকাদারি নিয়ে পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলী সোহেল রানার সঙ্গে সমন্বয়ক রানার বিরোধ দেখা দেয়। গত ২২ জুলাই এই বিরোধের সূত্র ধরে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের জেলা আহ্বায়ক ও সদস্যসচিবকে নিয়ে পৌরসভায় যান রানা। সেখানে স্থানীয় একটি পক্ষ তাঁদের অবরোধ করে রাখে। পরে রাজনৈতিক নেতাদের এবং প্রশাসনের হস্তক্ষেপে তাঁরা সেখান থেকে রক্ষা পান।
এছাড়া রানা সীমান্ত এলাকায় চোরাচালানের সঙ্গেও জড়িত বলে অভিযোগ আছে। সম্প্রতি তিনি মহেশপুর উপজেলা প্রশাসনের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার কাছে মোটা অঙ্কের চাঁদা দাবি করেন। চাঁদা দিতে রাজি না হওয়ায় রানা তাঁকে মব দিয়ে ভয় দেখান। ভীত হয়ে ওই কর্মকর্তা অন্যত্র বদলি নিয়ে চলে যান।
জেলা জুলাই যোদ্ধা সংসদের মুখ্য সংগঠক মেহেদী হাসান বাপ্পী বলেন, ‘জুলাই আন্দোলনের সময় মাঠে তাঁকে দেখা যায়নি। হঠাৎ শুনি সে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের নেতা হয়ে গেছে। এরপর থেকেই সমন্বয়ক পরিচয়ে মহেশপুরে নানা অপকর্ম চালিয়ে যাচ্ছে। এ বিষয়ে আমরা একাধিক দপ্তরে লিখিত অভিযোগ দিয়েছি, কিন্তু ফল পাইনি। উল্টো সে আমাদের মামলার ভয় দেখায়।’ তিনি আরও বলেন, ‘রানা আগে অভাবী ছিল, এখন সে লাখ টাকার মালিক। মোটরসাইকেলে ঘোরে, জমি কিনেছে। মূলত সে চাঁদাবাজি আর সীমান্ত অপরাধের মাধ্যমে টাকার পাহাড় গড়েছে।’
মহেশপুর পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলী সোহেল রানা জানান, ‘পৌরসভার কাজ হাতিয়ে নিতে সমন্বয়ক রানা ভয়ভীতি দেখায়। গত ২২ জুলাই একটি দরপত্রের ভাগ চেয়ে জেলা নেতাদের নিয়ে আসে, কিন্তু অন্য একটি পক্ষ বাধা দেওয়ায় তাঁরা পালিয়ে যায়।’
মহেশপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা খাদিজা আক্তার বলেন, ‘আমি এখানে সদ্য যোগ দিয়েছি। লোকজনের মুখে রানার অপকর্মের কথা শুনেছি। কেউ লিখিত অভিযোগ দিলে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
অন্যদিকে হামিদুর রহমান রানা তাঁর বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, ‘আমার বিরুদ্ধে একটি মহল অপপ্রচার চালাচ্ছে। আমি সংবাদ সম্মেলন করে আমার অবস্থান পরিষ্কার করেছি। এখন অনেকেই আমাদের সঙ্গে শত্রুতা করছে।’
খবরওয়ালা/এন