খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: 14শে মাঘ ১৪৩২ | ২৭ই জানুয়ারি ২০২৬ | 1150 Dhu al-Hijjah 5
বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবাহে দীর্ঘস্থায়ী মন্দা বিরাজ করছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, টানা সাত মাস ধরে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি ৭ শতাংশের নিচে অবস্থান করছে, যা দেশের শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থানের জন্য একটি নেতিবাচক সংকেত হিসেবে দেখা হচ্ছে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে এই প্রবৃদ্ধির হার কমে দাঁড়িয়েছে ৬.২০ শতাংশে, যা লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে অনেক কম। বিনিয়োগে স্থবিরতা, উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং রাজনৈতিক অনিশ্চয়তাকে এই পরিস্থিতির প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করছেন অর্থনীতিবিদ ও ব্যাংকাররা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবাহে এক বছরের ব্যবধানে বড় ধরনের পতন ঘটেছে। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে যেখানে ঋণের প্রবৃদ্ধি ছিল ৭.২৮ শতাংশ, ২০২৫ সালের একই সময়ে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৬.২০ শতাংশে। উল্লেখ্য যে, সর্বশেষ ২০২৪ সালের জুলাই মাসে এই প্রবৃদ্ধি দুই অংকের ঘর (১০.১৩%) স্পর্শ করেছিল, এরপর থেকেই এটি ধারাবাহিকভাবে হ্রাস পাচ্ছে।
বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবাহের সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান:
| সময়কাল | ঋণ প্রবৃদ্ধির হার (%) | বিশেষ মন্তব্য |
| জুলাই ২০২৪ | ১০.১৩% | সর্বশেষ দুই অংকের প্রবৃদ্ধি। |
| ডিসেম্বর ২০২৪ | ৭.২৮% | প্রবৃদ্ধি কমতে শুরু করার প্রাথমিক পর্যায়। |
| নভেম্বর ২০২৫ | ৬.৫৮% | ধারাবাহিক মন্দার ধারাবাহিকতা। |
| ডিসেম্বর ২০২৫ | ৬.২০% | লক্ষ্যমাত্রার (৭.২%) নিচে এবং রেকর্ড সর্বনিম্ন। |
| মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানি | ১৬% হ্রাস | জুলাই-নভেম্বর ২০২৫ পিরিয়ডে। |
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, “ব্যবসায়ীরা বর্তমানে নতুন কোনো বিনিয়োগ করছেন না। নতুন বিনিয়োগ না বাড়লে ব্যাংকের ঋণপ্রবাহ বাড়বে না। উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং আগামী নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে ব্যবসায়ীরা বড় ধরণের প্রকল্প গ্রহণে অনীহা দেখাচ্ছেন।” তিনি সতর্ক করে বলেন যে, বিনিয়োগ কমলে বেকারত্ব বাড়বে এবং জিডিপি প্রবৃদ্ধি ধীর হয়ে যাবে।
দেশের শীর্ষস্থানীয় শিল্প গ্রুপগুলোর অনেক কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়াও ঋণের চাহিদা কমার বড় কারণ। বেক্সিমকো, নাসা এবং গাজী গ্রুপের মতো বড় প্রতিষ্ঠানের অনেক ইউনিট বন্ধ থাকায় তারা আর ব্যাংক থেকে ঋণ নিচ্ছে না। এমনকি সচল থাকা কারখানাগুলোও তাদের উৎপাদন সক্ষমতার মাত্র ৬০-৭০ শতাংশ ব্যবহার করছে। ফলে মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানির এলসি সেটেলমেন্ট বা দায় পরিশোধ ১৬ শতাংশের বেশি কমে গেছে।
বর্তমানে মুদ্রানীতির সংকোচনমূলক অবস্থানের কারণে পলিসি রেট বা নীতি সুদহার ১০ শতাংশে অবস্থান করছে। এর ফলে ব্যাংকগুলোর ঋণের গড় সুদহার ১১ থেকে ১২ শতাংশে পৌঁছেছে। বিকেএমইএ-র সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম জানান, এত উচ্চ সুদহারে ঋণ নিয়ে ব্যবসা পরিচালনা করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। পর্যাপ্ত কাজের অর্ডার না থাকা এবং ব্যবসার খরচ বেড়ে যাওয়ায় অনেক উদ্যোক্তা ব্যাংক থেকে নতুন করে ঋণ নেওয়া বন্ধ করে দিয়েছেন।
বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, মূল্যস্ফীতি ৮.৪৯ শতাংশ থেকে কমে ৭ শতাংশের ঘরে না আসা পর্যন্ত নীতি সুদহার কমানো হবে না। ফলে ব্যবসায়ীদের জন্য সস্তায় ঋণ পাওয়ার সুযোগ নিকট ভবিষ্যতে ক্ষীণ বলে মনে হচ্ছে।
বেসরকারি খাতে ঋণের চাহিদা না থাকায় ব্যাংকগুলো এখন তাদের অলস অর্থ সরকারি সিকিউরিটিজে (ট্রেজারি বিল ও বন্ড) বিনিয়োগ করছে। বেসরকারি ব্যাংকগুলোর জন্য এটি এখন আয়ের প্রধান উৎসে পরিণত হয়েছে। ঝুঁকিহীন এই খাতে প্রায় ১১ শতাংশ পর্যন্ত সুদ পাওয়ায় শক্তিশালী ব্যাংকগুলোর মুনাফা বাড়ছে, যদিও এটি দেশের সামগ্রিক উৎপাদনশীল খাতের জন্য সুখকর নয়। সরকারও ঘাটতি বাজেট মেটাতে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে ব্যাপক হারে ঋণ নিচ্ছে, যা বেসরকারি খাতের জন্য ঋণের প্রাপ্যতা আরও সংকুচিত করছে।
বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবাহের এই মন্দা কাটাতে হলে সবার আগে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি। একই সাথে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে এনে সুদের হার কমিয়ে না আনলে শিল্প খাতের স্থবিরতা কাটবে না। নীতিনির্ধারকদের উচিত দ্রুত বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানোর কৌশল গ্রহণ করা, অন্যথায় দীর্ঘমেয়াদে কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।