খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: 10শে শ্রাবণ ১৪৩২ | ২৫ই জুলাই ২০২৫ | 1150 Dhu al-Hijjah 5
অধ্যাপক সৈয়দ আলী আহসান-একজন অনন্যসাধারণ সাহিত্যিক, প্রজ্ঞাবান শিক্ষাবিদ ও মুক্তিযুদ্ধকালীন স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের শব্দসৈনিক। তিনি ছিলেন এমন এক আলোকিত মানুষ, যিনি শিক্ষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি ও জাতির স্বাধীনতার সংগ্রামে রেখে গেছেন এক উজ্জ্বল চিহ্ন।
জন্ম ও শৈশব
তিনি জন্মগ্রহণ করেন ১৯২০ সালের ২৬ মার্চ, মাগুরা জেলার আলোকদিয়া গ্রামে। তাঁর পিতা সৈয়দ আলী হামেদ ছিলেন একজন স্কুল পরিদর্শক এবং মা সৈয়দা কামরুন্নেগার খাতুন ছিলেন ঢাকার নবাবগঞ্জ উপজেলার আগলা গ্রামের জমিদার পরিবারের সন্তান। পারিবারিক ঐতিহ্য ও জ্ঞানভিত্তিক পরিবেশেই গড়ে ওঠে তাঁর বুদ্ধিবৃত্তিক বেড়ে ওঠা।
শিক্ষা ও সাহিত্যচর্চা
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জনের পাশাপাশি ছাত্রজীবন থেকেই সাহিত্যচর্চায় যুক্ত হন। তাঁর লেখা গল্প, প্রবন্ধ ও কবিতা নিয়মিত প্রকাশিত হতো ‘আজাদ’, ‘মাসিক মোহাম্মদী’ ও ‘সওগাত’-এর মতো খ্যাতনামা পত্রিকায়।
সাহিত্য আন্দোলন ও শিক্ষকতা
তিনি ছিলেন ‘পূর্ব পাকিস্তান সাহিত্য সংসদ’-এর প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক। এই সংগঠনের মাধ্যমে তিনি পুঁথিসাহিত্য ও মুসলিম ঐতিহ্যের সমন্বয়ে একটি নবজাগরণধর্মী সাহিত্য আন্দোলন গড়ে তোলেন।
১৯৪৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে শিক্ষক হিসেবে যোগদানের পর তিনি ১৯৫৪ সালে করাচি বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের প্রধান নিযুক্ত হন। পরে বাংলা একাডেমির পরিচালক হিসেবে (১৯৬০–৬৭) তিনি অসামান্য সাংস্কৃতিক নেতৃত্ব দেন।
১৯৬৭ সালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে অধ্যাপক ও কলা অনুষদের ডিন হিসেবে যোগ দেন।
মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা-পরবর্তী ভূমিকা
১৯৭১ সালের মার্চে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে তিনি ভারতে চলে যান এবং কলকাতায় থেকে পুরো যুদ্ধকাল স্বাধীনতার পক্ষে সক্রিয়ভাবে কাজ করেন। লেখনী ও ভাষণে তিনি বিশ্বমতের সহানুভূতি অর্জনে অনন্য ভূমিকা রাখেন।
স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাকালীন উপাচার্য নিযুক্ত হন। পাশাপাশি তিনি সংবিধানের বাংলা ভাষ্য চূড়ান্তকরণ, জাতীয় সংগীতের ইংরেজি অনুবাদ, শিল্পকলা একাডেমির গঠনতন্ত্র প্রণয়নসহ একাধিক রাষ্ট্রীয় কর্মকাণ্ডে নেতৃত্ব দেন।
পরে তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য (১৯৭৫), রাষ্ট্রপতির উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য (১৯৭৭) এবং বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের চেয়ারম্যান ও জাতীয় অধ্যাপক (১৯৮৯) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
সাহিত্যকর্ম ও সম্মাননা
অধ্যাপক আহসান ছিলেন একজন প্রবন্ধকার, অনুবাদক, গবেষক ও কাব্যতাত্ত্বিক। তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে: ‘নজরুল ইসলাম’, ‘ওয়াল্ট হুইটম্যানের কবিতা’, ‘পদ্মাবতী’, ‘রবীন্দ্রনাথ: কাব্যবিচারের ভূমিকা’, ‘জার্মান সাহিত্য’, ‘মধুসূদন: কাব্য কবি ও কাব্যাদর্শ’, ‘কথাবিচিত’, ‘বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস (প্রাচীন, মধ্য ও আধুনিককাল)’ প্রভৃতি।
তাঁর অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি পেয়েছেন: বাংলা একাডেমি পুরস্কার (১৯৬৭), একুশে পদক (১৯৮৩), স্বাধীনতা পদক (১৯৮৭)
প্রয়াণ
এই বিশিষ্ট মনীষা আমাদের ছেড়ে চলে যান ২০০২ সালের ২৫ জুলাই। তাঁর মৃত্যুতে দেশের শিক্ষা, সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক অঙ্গন হারায় এক অনন্য পথপ্রদর্শককে।
শ্রদ্ধাঞ্জলি
অধ্যাপক সৈয়দ আলী আহসান ছিলেন একাধারে চিন্তাবিদ, শিক্ষক ও জাতির বিবেক। তাঁর রেখে যাওয়া আলোকবর্তিকা আমাদের আজও পথ দেখায়। তাঁর স্মৃতি আমাদের হৃদয়ে চিরজাগরুক থাকবে।
খবরওয়ালা/এমএজেড