খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক:
প্রকাশ: 26শে শ্রাবণ ১৪৩২ | ১০ই আগস্ট ২০২৫ | 1150 Dhu al-Hijjah 5
অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনুস দায়িত্ব গ্রহণের এক বছর পরেও ‘মব ভায়োলেন্স’-এর ভয়ে কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি পুলিশ। গত বছরের ৫ আগস্টের পর থেকে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে পুরো পুলিশ বাহিনী, ভেঙে পড়ে শৃঙ্খলা।
সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জুলাই আন্দোলনের পরিবর্তি পরিস্থিতিতে যেভাবে পুলিশের ঘুরে দাঁড়ানো প্রয়োজনীয়তা ছিল, তা হয়নি। ফলে জনমনে স্বস্তি ফিরছে না, পুলিশ নিজেও স্বস্তি পাচ্ছে না। অনেক ক্ষেত্রে অপরাধ সংঘটিত স্থলে পুলিশের সহযোগিতা চেয়েও পাওয়া যায় না। কারণ মানসিকভাবে ভেঙে পড়া পুলিশ সদস্যদের মধ্যে জনতার প্রতিশোধমূলক ‘মব ভায়োলেন্স’-এর ভয় এখনো কাজ করছে। যে কারণে পুলিশ এখনো বেশির ভাগ ক্ষেত্রে শক্ত হাতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় কাজ করতে পারছে না। তবে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে পুলিশ বাহিনী।
আগামী ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় নির্বাচনের ঘোষণা দিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। এ অবস্থায় নির্বাচন উপলক্ষে পুলিশ কতটুকু প্রস্তুত? এ বিষয়ে জানতে চাইলে পুলিশ মহাপরিদর্শক বাহারুল আলম বলেন, পুলিশ বাহিনীকে এক বছরের মধ্যে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। এজন্য আরও সময়ের দরকার। তবে সামনে যেহেতু একটি জাতীয় নির্বাচন রয়েছে, সেই নির্বাচনটিকে আমরা সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করার জন্য মাঠে কাজ করছি। আমাদের প্রধান লক্ষ্য নির্বাচনকে সুষ্ঠু করা।’
পুলিশের মনোবল কতখানি ফিরেছে? জানতে চাইলে পুলিশ মহাপরিদর্শক বাহারুল আলম বলেন, পুলিশকে টেনে তুলতে আরও সময় লাগবে। তারা ধীরে ধীরে এখন একটা জায়গায় পৌঁছেছে। আমি বলব না যে, পুলিশ পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়ে গেছে। কিন্তু অনেকটাই গোছালো জায়গায় এসেছে। এখন আমরা নির্বাচনের প্রস্তুতি নেওয়া শুরু করব।’
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং পুলিশ সদর দপ্তরের একাধিক সূত্র বলছে, গত বছর ৫ আগস্টের পর ঢাকাসহ দেশের অন্তত ৪৫০টি থানায় হামলা ও অগ্নিসংযোগ করা হয়। পুলিশ সদর দপ্তর, বিভিন্ন জেলা পুলিশের কার্যালয়, ট্রাফিক পুলিশ বক্সসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় হামলা ও ভাঙচুর হয়। আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয় অনেক থানা ভবনে। লুট করা হয় অস্ত্র, গোলাবারুদ ও সরঞ্জাম। অনেক পুলিশ সদস্য ইউনিফর্ম খুলে গা ঢাকা দেন।
এ সময় পুলিশকে কাজে ফেরানো এবং সক্রিয় করাই ছিল সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। নানামুখী পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে পুলিশকে কাজে ফেরানো হয়। সচল করা হয় ভেঙে পড়া প্রশাসনিক ব্যবস্থা। এরপর সামনে আসে অপরাধ দমন ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চ্যালেঞ্জ। এর সঙ্গে পুলিশের অভ্যন্তরীণ সংস্কারকাজ ও বাহিনীটিকে ঢেলে সাজানোর জন্য কাজ শুরু করে অন্তর্বর্তী সরকার।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, এরই অংশ হিসেবে রদবদলের মাধ্যমে সারাদেশে ৫০ সহস্রাধিক পুলিশের রদবদল করা হয়। গ্রেপ্তার করা হয় ৬৩ পুলিশ কর্মকর্তা ও সদস্যকে। এছাড়া বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয় ৫৫ জন পুলিশ কর্মকর্তাকে।
পুলিশ সদর দপ্তরের এক অপরাধ পরিসংখ্যান পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, ২০২৪ সালের জুলাই থেকে চলতি বছরের জুন পর্যন্ত গত এক বছরে খুনের মামলা হয়েছে ৩ হাজার ৮৩২টি। এর মধ্যে গত জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত খুনের মামলা হয় ১ হাজার ৯৩৩টি। আর আগের ছয় মাসে এ সংক্রান্ত মামলা হয় ১ হাজার ৮৯৯টি। অন্যদিকে ২০২৩ সালের আগস্ট থেকে ২০২৪-এর জুন পর্যন্ত ১১ মাসে সারাদেশে খুনের মামলা হয়েছে ২ হাজার ৭৪২টি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক এবং সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক বলেন, ৫ আগস্টের পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে পুলিশের যেভাবে ঘুরে দাঁড়ানোর প্রয়োজনীয়তা ছিল, তা হয়নি। এর অন্যতম কারণ অনেক পুলিশ সদস্য নৈতিক ও মনোবলসংকটে পড়েছে। তাদের কর্মকাণ্ড সমালোচিত ও বিতর্কিত হয়েছে। তাই এই পরিস্থিতি এত দ্রুত স্বাভাবিক হবে না। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ ঘটাতে হলে ভালো কাজের মাধ্যমে পুলিশকেই তাদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ ও বিতর্কের অবসান ঘটাতে হবে।
খবরওয়ালা/এমইউ