খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: শনিবার, ৩ জানুয়ারি ২০২৬
নেত্রকোনায় অর্থের বিনিময়ে রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশি জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) করানোর চরম অভিযোগ উঠে এসেছে। এক অনুসন্ধানে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, সদর উপজেলা নির্বাচন অফিসের একটি সংঘবদ্ধচক্র নিয়মবহির্ভূতভাবে রোহিঙ্গাদের ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করছে। এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে রোহিঙ্গারা পাচ্ছে বাংলাদেশি নাগরিকত্বের বৈধতার প্রতীক, যা জাতীয় নিরাপত্তা এবং রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার জন্য গুরুতর হুমকি হিসেবে ধরা হচ্ছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, জান্নাত বেগম নামে একজন রোহিঙ্গার জন্য তৈরি করা হয়েছে একটি ভোটার ও এনআইডি। তার পরিচয়পত্রের নম্বর ৩৩৩১০৮৯৫৮৫। বাবার নাম মো. আব্দুল হাসিম, মাতার নাম মোসা আনজু এবং ঠিকানা হিসেবে নেত্রকোনা সদর উপজেলার পুকুরিয়া গ্রাম উল্লেখ করা হয়েছে। তবে বাস্তব যাচাইয়ে দেখা গেছে, আব্দুল হাসিম ও আনজু প্রকৃতপক্ষে মোহনগঞ্জ উপজেলার বিরামপুর গ্রামের স্থায়ী বাসিন্দা ছিলেন।
প্রায় ১০ বছর আগে আব্দুল হাসিম মৃত্যুবরণ করেছেন। তাদের চার ছেলে ও এক মেয়ে রয়েছে, যার নাম সিগ্ধা আক্তার হাসি। জান্নাত বেগম নামে কোনো কন্যাসন্তান এই পরিবারের নেই। পরিবার সদস্য মোতাহার হোসেন বলেন, “আমার জান্নাত বেগম নামে কোনো বোন নেই। আমার একমাত্র বোন সিগ্ধা আক্তার হাসি। সে আট বছর আগে ধর্মপাশায় বিয়ে করেছে এবং সেখানকার ভোটার।”
স্থানীয় ইউপি সদস্য আলী নূরও নিশ্চিত করেন, “জান্নাত বেগম নামে কোনো সন্তান নেই। যদি কেউ এই পরিচয় ব্যবহার করে ভোটার হয়ে থাকে, তা সরাসরি জালিয়াতি।”
ভোটার ডাটা এন্ট্রিতে ব্যবহৃত মোবাইল নম্বর যাচাই করলে দেখা যায়, তা বন্ধ। হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে যোগাযোগ করলে নম্বরটির ব্যবহারকারী আরফান শাকিল (ময়মনসিংহের আকুয়া এলাকার বাসিন্দা, বর্তমানে চীনে শিক্ষার্থী) জানান, জান্নাত বেগম নামের কোনো পরিচিত নেই।
জন্ম নিবন্ধন যাচাইয়ে জানা যায়, জান্নাত বেগমের কোনো জন্ম নিবন্ধন নেত্রকোনা পৌরসভার সার্ভারে নেই। এটি অন্য একটি জন্ম নিবন্ধনের কপি ডিজিটালি সম্পাদনা করে তৈরি করা হয়েছে। ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্তির জন্য পূরণ করা ফরম-২-এ শনাক্তকারী, সুপারভাইজার ও যাচাইকারীর এনআইডি নম্বর থাকলেও সার্ভারে এর কোনো অস্তিত্ব নেই।
নির্বাচন অফিস সূত্রে জানা যায়, দেড় লাখ টাকার বিনিময়ে জান্নাত বেগমকে ভোটার করা হয়েছে। সদর উপজেলা নির্বাচন অফিসার মো. সিহাব উদ্দিনের স্বাক্ষরও ফরমে রয়েছে (তারিখ: ২১ মার্চ, ২০২৫)। একইভাবে ৫০–৬০টি এনআইডি প্রায় ১.৫–২ লাখ টাকার বিনিময়ে তৈরি হয়েছে।
অভিযোগের বিষয়ে সদর উপজেলা নির্বাচন অফিসার বলেন, “ভোটার হালনাগাদের সময় জান্নাত বেগম ভোটার হয়েছেন। এতগুলো এনআইডি আলাদাভাবে যাচাই করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। কোনো লেনদেন হয়নি।”
জেলা প্রশাসক সাইফুর রহমান বলেন, “তদন্তে সত্যতা পেলে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
এর আগে নেত্রকোনায় রোহিঙ্গাদের ভুয়া কাগজপত্র তৈরির ঘটনার নজির রয়েছে। গত ২৫ ডিসেম্বর মোহনগঞ্জ উপজেলায় ইউএনওর আইডি ও পাসওয়ার্ড ব্যবহার করে ১৩ রোহিঙ্গার জন্ম নিবন্ধন তৈরি করা হয়েছিল। এছাড়া কলমাকান্দা উপজেলার রামনাথপুর পাগলা এলাকায় একটি রোহিঙ্গা অর্থের বিনিময়ে জাতীয় পরিচয়পত্র ও পাসপোর্ট সংগ্রহ করেছিল।
সংশ্লিষ্ট তথ্য (টেবিল আকারে):
| বিষয় | তথ্য |
|---|---|
| নকল এনআইডি নাম | জান্নাত বেগম |
| এনআইডি নম্বর | ৩৩৩১০৮৯৫৮৫ |
| উল্লেখিত বাবা-মা | মো. আব্দুল হাসিম, মোসা আনজু |
| বাস্তব বাবা-মা | মো. আব্দুল হাসিম (মৃত), মোসা আনজু |
| বাস্তব কন্যা | সিগ্ধা আক্তার হাসি |
| প্রাপ্ত অর্থ | ১.৫–২ লাখ টাকা |
| ভোটার ফরম স্বাক্ষর | মো. সিহাব উদ্দিন, ২১ মার্চ, ২০২৫ |
| প্রভাবিত এনআইডির সংখ্যা | ৫০–৬০টি |