খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: রবিবার, ৫ এপ্রিল ২০২৬
ভারত ও পাকিস্তানের ক্রিকেট উন্মাদনা যখন তুঙ্গে, তখন এক অদ্ভুত সমাপতন ক্রিকেটবিশ্বকে চমকে দিয়েছে। আইপিএল (IPL) ও পিএসএল (PSL)—দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী দেশের ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগেই বর্তমানে ব্যাটিং তালিকার শীর্ষে অবস্থান করছেন দুই তরুণ তুর্কি, যাঁদের নামেই রয়েছে অভিন্নতা। তারা হলেন ভারতের সামির রিজভি এবং পাকিস্তানের সামির মিনহাস। যদিও দেশ ও লিগ ভিন্ন, কিন্তু ২২ গজের পিচে তাদের দাপট যেন একই সুতোয় গাঁথা।
আইপিএলের আঙিনায় সামির রিজভি নামটির সঙ্গে ক্রিকেটপ্রেমীদের পরিচয় বছর তিনেক আগে থেকে। তবে তাঁর উত্থান রূপকথার চেয়ে কম কিছু নয়। ২০২৪ সালের নিলামে মাত্র ২০ লাখ রুপি ভিত্তিমূল্যের এই ক্রিকেটারকে যখন চেন্নাই সুপার কিংস (CSK) ৮ কোটি ২০ লাখ রুপিতে দলে ভেড়ায়, তখন অনেকেই ভ্রু কুঁচকেছিলেন। ধোনি ও ফ্লেমিংয়ের জহুরি চোখ তাঁর মাঝে প্রতিভা দেখলেও, চেন্নাইয়ের হয়ে প্রত্যাশার চাপ সামলাতে ব্যর্থ হন তিনি। ৮ ম্যাচে মাত্র ৫১ রান করে তিনি দল থেকে ছিটকে পড়েন।
তবে দিল্লির হয়ে তাঁর পুনর্জন্ম ঘটেছে। মাত্র ৯৫ লাখ রুপিতে দিল্লি ক্যাপিটালস তাঁকে দলে নিলেও, এবারের আসরে তিনি যেন এক ভিন্ন রূপে আবির্ভূত হয়েছেন। মৌসুমের প্রথম দুই ম্যাচেই দলকে একাই জেতানোর কৃতিত্ব দেখিয়েছেন তিনি। লক্ষ্ণৌ সুপার জায়ান্টসের বিপক্ষে ৭০* এবং মুম্বাই ইন্ডিয়ানসের বিপক্ষে ৯০ রানের বিধ্বংসী ইনিংস খেলে তিনি আইপিএলে টানা তিন ম্যাচে ‘ম্যান অব দ্য ম্যাচ’ হওয়ার এক বিরল নজির গড়েছেন। আইপিএল ইতিহাসে এই কৃতিত্ব অর্জনকারী অষ্টম খেলোয়াড় হিসেবে তিনি এখন আলোচনার কেন্দ্রে।
অন্যদিকে, পাকিস্তান সুপার লিগে (PSL) ব্যাট হাতে ঝড় তুলছেন ১৯ বছর বয়সী উদীয়মান ওপেনার সামির মিনহাস। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের পাদপ্রদীপের আলোয় তিনি আসেন মূলত গত ডিসেম্বরের অনূর্ধ্ব-১৯ এশিয়া কাপের মাধ্যমে। ভারতের বিপক্ষে ফাইনালে ১১৩ বলে ১৭১ রানের যে মহাকাব্যিক ইনিংসটি তিনি খেলেছিলেন, তা যুব ওয়ানডেতে পাকিস্তানের কোনো ব্যাটসম্যানের সর্বোচ্চ রানের রেকর্ড।
পিএসএলের বর্তমান মৌসুমে ইসলামাবাদ ইউনাইটেডের হয়ে প্রথম তিন ম্যাচে তাঁর ধারাবাহিকতা ছিল চোখ ধাঁধানো। প্রথম ম্যাচে ২৮ রান করলেও, পরের দুই ম্যাচে যথাক্রমে ৮২* এবং ৭০ রান করে তিনি সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহকের দৌড়ে শীর্ষে রয়েছেন। তাঁর ভাই আরাফাত মিনহাসও একজন প্রতিভাবান অলরাউন্ডার, যিনি বর্তমানে মুলতান সুলতানসের হয়ে খেলছেন।
নিচে দুই লিগের এই দুই সেরা পারফর্মারের বর্তমান পারফরম্যান্সের একটি তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরা হলো:
| বৈশিষ্ট্য | সামির রিজভি (আইপিএল) | সামির মিনহাস (পিএসএল) |
| দল | দিল্লি ক্যাপিটালস | ইসলামাবাদ ইউনাইটেড |
| ম্যাচ সংখ্যা | ২ | ৩ |
| মোট রান | ১৬০ | ১৮০ |
| সর্বোচ্চ রান | ৯০ | ৮২* |
| স্ট্রাইক রেট | ১৬৫.৫০ (প্রায়) | ১৪৫.২০ (প্রায়) |
| ম্যাচসেরা | ২ বার | ১ বার |
পাকিস্তানি সামিরের সাফল্যের পেছনে রয়েছে তাঁর বাবা কাশিফ মিনহাজের নিরলস প্রেরণা। কাশিফ নিজে একজন টেপ বল ক্রিকেটের পরিচিত মুখ ছিলেন। পেশায় ক্রীড়া আলোকচিত্রী হলেও তিনি তাঁর সন্তানদের পেশাদার ক্রিকেটে আসার পূর্ণ সুযোগ করে দিয়েছেন। সামির মিনহাসের ম্যাচসেরার পুরস্কার নেওয়ার মুহূর্তটি যখন তাঁর বাবা নিজের ক্যামেরায় ফ্রেমবন্দী করছিলেন, তখন তা এক আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি করেছিল।
অন্যদিকে, ভারতীয় সামির রিজভি তাঁর হারানো আত্মবিশ্বাস ফিরে পেয়েছেন দিল্লির মেন্টর ও কোচদের ছোঁয়ায়। ক্রিকেট বিশ্লেষকদের মতে, সামির রিজভির টাইমিং এবং চাপের মুখে শান্ত থাকার ক্ষমতা তাঁকে ভবিষ্যতে ভারতের জাতীয় দলেও জায়গা করে দিতে পারে।
দুই ভিন্ন লিগ, ভিন্ন দেশ এবং ভিন্ন প্রেক্ষাপট হওয়া সত্ত্বেও ‘সামির’ নামের এই দুই ক্রিকেটারের জয়যাত্রা প্রমাণ করে যে, ক্রিকেটে প্রতিভাকে কোনো ভৌগোলিক সীমারেখায় আটকে রাখা যায় না। ভক্তরা এখন অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছেন, এই দুই তরুণ ব্যাটার নিজেদের ফর্ম ধরে রেখে টুর্নামেন্টের শেষ পর্যন্ত শ্রেষ্ঠত্ব বজায় রাখতে পারেন কি না।