খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: 25শে বৈশাখ ১৪৩২ | ৮ই মে ২০২৫ | 1149 Dhu al-Hijjah 5
আওয়ামী লীগ ১৯৫৪ সালের মুসলিম লীগের মতোই রাজনৈতিকভাবে উৎখাত হয়ে গেছে বলে মন্তব্য করেছেন প্রবীণ বামপন্থী রাজনীতিক, লেখক ও গবেষক বদরুদ্দীন উমর।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, ফ্যাসিবাদী শাসনের বিরুদ্ধে জনঅসন্তোষ দীর্ঘদিন ধরে জমা হচ্ছিল, যার বিস্ফোরণ ঘটায় কোটা আন্দোলন—এবং তা পরিণত হয় গণঅভ্যুত্থানে।
সম্প্রতি একটি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, “একটা দেশে অভ্যুত্থান তখনই হয় যখন সাধারণ নির্বাচন কিংবা শান্তিপূর্ণ সরকার পরিবর্তনের পথ বন্ধ হয়ে যায়। বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে সেই পথ বন্ধ ছিল। আওয়ামী লীগ রাজনৈতিক প্রতিপক্ষদের দমন করে একদলীয় শাসন কায়েম করেছিল।”
তিনি বলেন, “আওয়ামী লীগ মানুষের ওপর ব্যাপক নির্যাতন চালিয়েছে। রাজনৈতিক দলগুলোকে নিঃশেষ করতে চেয়েছিল। ফ্যাসিবাদের এই দমননীতি জনগণ বুঝতে পেরেছিল, কিন্তু সংগঠিত প্রতিরোধের অবলম্বন পাচ্ছিল না। সেই জায়গায় কোটা আন্দোলন স্ফুলিঙ্গ হিসেবে কাজ করেছে।”
উমরের মতে, কোটা সংস্কার আন্দোলন মূলত বৈষম্যের বিরুদ্ধে ছিল, কিন্তু আওয়ামী লীগের ছাত্রসংগঠন ছাত্রলীগ যেভাবে সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর দমন চালিয়েছিল, সেটাই আন্দোলনের বিস্তার ঘটায়। “এই ভিত্তি না থাকলে শুধু কোটার দাবিতে আন্দোলন সফল হতো না,”—বলেন তিনি।
তিনি আরও বলেন, “শেখ হাসিনা যদি আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আপস করতেন, হয়তো কিছুদিন ক্ষমতায় থাকতে পারতেন। কিন্তু তিনি চরম ঔদ্ধত্য দেখিয়েছেন। শিক্ষার্থীদের দাবি তো মানলেনই না, বরং তাদের আরও দমন করলেন। এই ঔদ্ধত্যই তাঁর পতনের মূল কারণ হয়ে দাঁড়ায়।”
আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে উমর বলেন, “কোটা আন্দোলন ছিল স্ফুলিঙ্গ, যা জনগণের জমে থাকা ক্ষোভে দাবানলে রূপ নেয়। জনগণ প্রতিরোধের সুযোগ খুঁজছিল—সেই সুযোগটা পেয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে।”
আওয়ামী লীগের পতনকে অন্যান্য দেশের সঙ্গে তুলনা করে বদরুদ্দীন উমর বলেন, “আরব বসন্তে তিউনিসিয়ার শাসক পালিয়েছিলেন, কিন্তু তার দলের অন্যরা থেকে গিয়েছিল। কিন্তু বাংলাদেশে শেখ হাসিনার পতনের পর হাজার হাজার আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মী দেশ ছেড়ে পালিয়েছে। কারণ তারা জানত, দেশে থাকলে জনগণ প্রতিশোধ নেবে। এমন ঘটনা বিশ্বের আর কোথাও হয়নি।”
তিনি বলেন, “১৯৫৪ সালে মুসলিম লীগ উৎখাতের পর তাদের আর ফিরে আসার সুযোগ হয়নি। আজকের আওয়ামী লীগের অবস্থাও একই। অনেকে ভাবেন দলটি আবার ঘুরে দাঁড়াবে, কিন্তু বাস্তবতা হলো—আওয়ামী লীগ ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে নিক্ষিপ্ত হয়েছে।”
ভারতের ভূমিকা নিয়েও বক্তব্য দেন উমর। তিনি বলেন, “১৯৫৪ সালে পাকিস্তানে মুসলিম লীগ যখন ক্ষমতাচ্যুত হয়, তখন ভারতের কোনো হস্তক্ষেপ ছিল না। কিন্তু আজকের বাংলাদেশে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং তাঁর সরকার নানা ষড়যন্ত্রে লিপ্ত। মোদি মুখে যাই বলুন না কেন, বাংলাদেশ নিয়ে ভারতের গভীর হস্তক্ষেপ আজ স্পষ্ট।”
উমর তার বক্তব্যের উপসংহারে বলেন, “আওয়ামী লীগ যেমন পতিত হয়েছে, তেমনি তার ভয়ংকর দমননীতিও ইতিহাস হয়ে গেছে। জনগণের ওপর যে নিপীড়ন তারা চালিয়েছে, তা বাংলাদেশের ইতিহাসে নজিরবিহীন। এই নিপীড়নের জন্যই তারা আজ দেশ ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়েছে।”