খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: 14শে ফাল্গুন ১৪৩২ | ২৬ই ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | 1150 Dhu al-Hijjah 5
উত্তরাঞ্চলের আলুচাষিরা গত বছরের বিপর্যয়কর পরিস্থিতি থেকে এখনো বের হতে পারেননি। আলুর বাজারদর হঠাৎ নিম্নমুখী হওয়ায় বহু কৃষক ঋণের বোঝা ও লোকসানের মধ্যে পড়েছেন। তিন মাস পার হলেও সরকারের প্রণোদনা এখনো কৃষকের হাতে পৌঁছায়নি। এতে ক্ষতিগ্রস্ত আলুচাষিরা নতুন মৌসুমে আবারও অনিশ্চয়তার মুখোমুখি হচ্ছেন।
কৃষি মন্ত্রণালয় গত নভেম্বরে ক্ষতিগ্রস্ত চাষির জন্য প্রণোদনার ঘোষণা দিয়েছিল। এ সময়ের কৃষি উপদেষ্টা ও স্থানীয় কর্মকর্তারা একাধিকবার গণমাধ্যমে প্রণোদনার কথা জানালেও বাস্তবে তা কার্যকর হয়নি। উপজেলা পর্যায়ে কৃষি কর্মকর্তারা তালিকা তৈরি করে পাঠালেও অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে অনুমোদন মেলেনি।
সরকার গত বছরের আগস্টে বাজারে আলুর দাম স্থিতিশীল রাখতে এবং কৃষকের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে ৫০ হাজার টন আলু সরাসরি কেনার ঘোষণা দিয়েছিল। তবে তা বাস্তবায়ন হয়নি। একই সময়ে হিমাগারের ফটকে আলুর ন্যূনতম দাম কেজিপ্রতি ২২ টাকা নির্ধারণ করা হলেও কৃষকরা সেই দাম পাননি। ফলে হাজার হাজার টন আলু হিমাগারে পচনশীল অবস্থায় আছে।
নতুন মৌসুমে আলুর উৎপাদন খরচও বেড়েছে। সার ও কীটনাশকের দাম বৃদ্ধি এবং বাজারে নতুন আলুর সঙ্গে পুরনো আলুর মজুদের কারণে কেজিপ্রতি দাম উৎপাদন খরচের নিচে নেমে গেছে। কৃষি বিশ্লেষকরা মনে করেন, সরকারি ক্রয় কার্যক্রম বাস্তবায়ন না হওয়া, ন্যূনতম দর নিশ্চিতে ব্যর্থতা এবং প্রণোদনা বিলম্বে সংকট আরও গভীর হয়েছে।
| জেলা | আবাদ (হেক্টর) | উৎপাদন (টন) | বাজারদর (কেজি) | উৎপাদন খরচ (কেজি) | সম্ভাব্য লোকসান প্রতি বিঘা (টাকা) |
|---|---|---|---|---|---|
| বগুড়া | ৯০,০০০ | ১০,০০,০০০ | ৮-১২ | ১৪-১৮ | ১৫,০০০-২৫,০০০ |
| জয়পুরহাট | ৬৫,০০,০০০ | ৬,৩০,০০০ | ১২-১৫ | ১৪-১৮ | ১৫,০০০-২০,০০০ |
| রংপুর | ৯০,০০,০০০ | ৯,০০,০০০ | ৪-৬ | ১৫-১৬ | ৯-১১,০০০ |
| সিরাজগঞ্জ | ৪৫,০০,০০০ | ৪৮,০০,০০০ | ১২-১৫ | ১৪-১৬ | ১২,০০০-২০,০০০ |
| নওগাঁ | ৫০,০০,০০০ | ৫৫,০০,০০০ | ১২-১৫ | ১৪-১৮ | ১৫,০০০-২২,০০০ |
উপরের তথ্য থেকে দেখা যায়, উৎপাদন বৃদ্ধি সত্ত্বেও বাজারদর উৎপাদন খরচের নিচে নেমে যাওয়ায় বিঘাপ্রতি উল্লেখযোগ্য ক্ষতি হচ্ছে।
জয়পুরহাট, নওগাঁ, সিরাজগঞ্জ ও রংপুরের কৃষকরা জানাচ্ছেন, কেজিপ্রতি আলুর দাম ৪ থেকে ১৫ টাকার মধ্যে স্থিত। অনেক ক্ষেত্রে আলু বিক্রি না হওয়ায় তা মাঠে পড়ে থাকে বা গবাদিপশুর খাদ্য হিসেবে ব্যবহার হয়। হিমাগার মালিকরাও সংরক্ষণের ভাড়ার অর্ধেক অগ্রিম নেওয়ার পদ্ধতি শুরু করেছেন।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. আবদুর রহিম জানিয়েছেন, প্রণোদনার জন্য চাষির তালিকা প্রস্তুত হয়েছে এবং প্রস্তাবনা বর্তমানে অর্থ মন্ত্রণালয়ে আছে। তিনি বলেন, প্রণোদনা কার্যকর হলে কৃষকের ক্ষতি কিছুটা হ্রাস পেতে পারে।
উত্তরাঞ্চলের তিন জেলায় আলুর দুই মৌসুমে ক্ষতির পরিমাণ প্রায় এক হাজার ২০০ থেকে এক হাজার ৫০০ কোটি টাকার মধ্যে। কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, “অতীতের লোকসান সামলে না উঠতেই নতুন ক্ষতি দেখা দিয়েছে। শুধুমাত্র ঘোষণাই যথেষ্ট নয়; সময়মতো কার্যকর পদক্ষেপ ছাড়া আলুচাষি বিপর্যয়ের সম্মুখীন হবেন।”
বর্তমানে নতুন মৌসুমেও কৃষকরা আলুর চাষে ঝুঁকিতে রয়েছেন। সরকারী প্রণোদনা, কার্যকরী ক্রয় ব্যবস্থা এবং বাজার নিয়ন্ত্রণ ছাড়া উৎপাদন খরচের তুলনায় বাজারদর স্বাভাবিক হবে না। অন্যথায় উৎপাদন বৃদ্ধি কৃষকের জন্য বারবার ক্ষতির কারণ হয়ে ফিরে আসবে।