এবিএম জাকিরুল হক টিটন
প্রকাশ: 4শে আষাঢ় ১৪৩২ | ১৮ই জুন ২০২৫ | 1149 Dhu al-Hijjah 5
১৯৪৮ সালের গ্রীষ্ম। মধ্যপ্রাচ্যের আকাশ তখন দাউদাউ করে জ্বলছে। শতাব্দী প্রাচীন ভূমি বিভক্ত হলো—ইহুদি আর আরবদের স্বপ্ন, আশ্রয় আর অধিকারকে ঘিরে। ব্রিটিশ শাসনের অবসান ঘটিয়ে ঘোষণা করা হলো ইসরায়েলের স্বাধীনতা। আর সেই ঘোষণাই যেন বিস্ফোরণ হয়ে ফিরে এলো। মিশর, জর্ডান, সিরিয়া, লেবানন আর ইরাক একসাথে ঝাঁপিয়ে পড়ল সদ্য জন্ম নেওয়া রাষ্ট্রটির ওপর।
এ ছিল প্রথম আরব-ইসরায়েল যুদ্ধ—একপাশে স্বাধীনতার উল্লাস, আরেকপাশে ‘নাকবা’—ফিলিস্তিনিদের দুর্ভাগ্য, দেশছাড়া আর উদ্বাস্তু জীবনের সূচনা।
কিন্তু ইতিহাস থেমে থাকেনি।
১৯৫৬ সালে মিশরের প্রেসিডেন্ট নাসের সুয়েজ খাল জাতীয়করণ করতেই যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স আর ইসরায়েল একত্র হয়ে আক্রমণ চালাল। সামরিকভাবে জিতলেও যুক্তরাষ্ট্র আর সোভিয়েত ইউনিয়নের চাপে শেষ পর্যন্ত পিছু হটতে হলো। এই যুদ্ধই ‘সুয়েজ সংকট’ নামে ইতিহাসে অমর—যেখানে যুদ্ধক্ষেত্রের জয়ও কূটনীতির কাছে হেরে গিয়েছিল।
এরপর আসে ১৯৬৭ সালের ছয় দিনের যুদ্ধ। মাত্র ছয় দিনে ইসরায়েল মিশর, জর্ডান আর সিরিয়াকে পরাজিত করে দখল করে নিল পশ্চিম তীর, গাজা, সিনাই আর গোলান হাইটস। এই বিজয়ে মধ্যপ্রাচ্যের মানচিত্র বদলে গেল—আর আগুনের যে শিখা জ্বলল, তা আজও নিভে যায়নি।
১৯৭৩ সালে সেই আগুনে নতুন ঘি ঢালে ইয়োম কিপ্পুর যুদ্ধ। আরব জোট—মিশর আর সিরিয়া—ইসরায়েলের ধর্মীয় উপবাস দিবসে আকস্মিক আক্রমণ চালায়। ইসরায়েল ঘুরে দাঁড়ালেও যুদ্ধের পর শান্তিচুক্তির ইতিহাস রচিত হয়—১৯৭৯ সালে কায়রোর চুক্তি, মিশর-ইসরায়েল মিলে বসে এক টেবিলে।
কিন্তু সেই শান্তি কতটুকু স্থায়ী হলো?
১৯৮২ সালে উত্তপ্ত হলো লেবাননের সীমান্ত। ফিলিস্তিনি গেরিলা আক্রমণ থামাতে ইসরায়েল চালালো ‘অপারেশন পিস ফর গালিলি’। যুদ্ধ থামাল না শুধু পিএলও-কে, বরং জন্ম দিল নতুন এক শক্তি—হিজবুল্লাহর। লেবাননের মাটি রক্তে রঙিন হলো, দেশটিকে গৃহযুদ্ধের দিকে ঠেলে দিল।
সবচেয়ে ভয়াবহ অধ্যায় শুরু হলো গাজা যুদ্ধ দিয়ে—২০০৮ থেকে যা আজও থামেনি। একের পর এক অভিযান: ‘অপারেশন কাস্ট লেড’, ‘পিলার অফ ডিফেন্স’, ‘প্রটেকটিভ এজ’, ‘গার্ডিয়ান অব দ্য ওয়ালস’ আর সর্বশেষ ‘অপারেশন আয়রন সোর্ডস’।
প্রতিবারই একই দৃশ্য—আকাশে রকেট, মাটিতে ধ্বংসস্তূপ, মানুষের আর্তনাদ আর শোক। হাজার হাজার ফিলিস্তিনি মারা গেলেন, গাজা রূপ নিল এক সীমাহীন মানবিক বিপর্যয়ের মঞ্চে।
| যুদ্ধ | সাল | ফলাফল |
|---|---|---|
| ১ম | ১৯৪৮ | ইসরায়েলের জন্ম; ফিলিস্তিনি উদ্বাস্তু |
| ২য় | ১৯৫৬ | ইসরায়েলের সামরিক জয়; মিশরের কূটনৈতিক সাফল্য |
| ৩য় | ১৯৬৭ | ইসরায়েলের বিস্তৃত দখল |
| ৪র্থ | ১৯৭৩ | আরবদের প্রাথমিক সাফল্য; পরে শান্তিচুক্তি |
| লেবানন | ১৯৮২ | পিএলও বিতাড়ন; হিজবুল্লাহর উত্থান |
| গাজা যুদ্ধ | ২০০৮–বর্তমান | পুনঃপুন সংঘর্ষ; মানবিক বিপর্যয় |
অন্তিম কথাটা স্পষ্ট, এটি কেবল ভূখণ্ডের জন্য যুদ্ধ নয়। এটি ইতিহাস, জাতি, আত্মপরিচয় আর অস্তিত্বের জন্য অবিরাম সংগ্রাম। একপাশে ইসরায়েল—অস্তিত্ব রক্ষায় কঠোর; আরেকপাশে ফিলিস্তিন—হারানো ভিটেমাটি ফিরে পেতে অটল। আর মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে বিশ্ব বিবেক।
আজও শান্তির ক্ষুদ্র আশা লুকিয়ে আছে ধূলায় ঢাকা কোনো শিশুর চোখে, কোনো বিধবার নিঃশব্দ প্রার্থনায়, অথবা কোনো ধ্বংসস্তূপের পাশে নিঃশব্দ চিৎকারে।
মধ্যপ্রাচ্যের রক্তাক্ত ইতিহাস যতই দীর্ঘ হোক, শেষ পর্যন্ত মানুষ শান্তির স্বপ্নেই চোখ মেলে রাখে।
লেখক: সম্পাদক ও প্রকাশক, খবরওয়ালা
খবরওয়ালা/এন