খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: শনিবার, ৩ জানুয়ারি ২০২৬
নতুন বছরের প্রথম প্রহর। সুইজারল্যান্ডের ক্রানস মন্টানা এলাকার অভিজাত স্কি রিসোর্টটি তখন কানায় কানায় পূর্ণ। রিসোর্টের ভূগর্ভস্থ ‘লে কনস্টেলেশন’ পানশালায় চলছিল বছরের প্রথম দিন উদযাপনের জমকালো আয়োজন। গানবাজনা, নাচ আর শ্যাম্পেনের ঝংকারে মাতোয়ারা ছিলেন শত শত তরুণ-তরুণী। তারা ইউরোপের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে এসেছিলেন একরাশ স্বপ্ন আর আনন্দ নিয়ে। কিন্তু কে জানত, ভোরের সূর্য ওঠার আগেই অনেকের জীবনপ্রদীপ চিরতরে নিভে যাবে।
অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাত ও ভয়াবহতা
রাত তখন আনুমানিক দেড়টা। উৎসব যখন তুঙ্গে, ঠিক তখনই পানশালার ভেতর আগুনের সূত্রপাত হয়। প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা অনুযায়ী, একজন বারটেন্ডার তাঁর এক নারী সহকর্মীকে কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন। ওই নারীর হাতে থাকা শ্যাম্পেনের বোতলে একটি জ্বলন্ত ফ্লেয়ার বা ফুলঝুরি ছিল। তাঁরা যখন পানশালার কাঠের সিলিংয়ের খুব কাছাকাছি পৌঁছান, তখনই আগুনের শিখা ছাদে ধরে যায়। আবার অনেক প্রত্যক্ষদর্শীর মতে, সিসা পাইপের কয়লা থেকেও আগুনের সূত্রপাত হতে পারে।
আগুন লাগার মাত্র কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে পুরো ছাদ লেলিহান শিখায় ছেয়ে যায়। ভূগর্ভস্থ কক্ষটি মুহূর্তের মধ্যে ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে। মানুষ প্রথমে একে বিস্ফোরণ ভেবে আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। সরু সিঁড়ি দিয়ে বের হওয়ার পথে শুরু হয় হুড়োহুড়ি আর পদদলিত হওয়ার ঘটনা। কেউ কেউ কাঁচের দেয়াল ও জানালা ভেঙে বের হওয়ার চেষ্টা করেন, আবার কেউ পরনের সোয়েটার দিয়ে আগুন নেভানোর আপ্রাণ চেষ্টা চালান। কিন্তু দাহ্য পদার্থের উপস্থিতিতে আগুন এতটাই দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে যে উদ্ধার পাওয়ার সুযোগ ছিল খুবই সীমিত।
হতাহতের পরিসংখ্যান ও উদ্ধার অভিযান
ঘটনাস্থলে স্থানীয় প্রশাসন ও ফায়ার সার্ভিসের বিশাল দল মোতায়েন করা হয়। প্রায় ৪০টি অ্যাম্বুলেন্স এবং ১০টি হেলিকপ্টার সারা রাত উদ্ধার অভিযানে অংশ নেয়। স্থানীয় পুলিশ কর্মকর্তা ফ্রেডরিখ গিসলারের তথ্যমতে, এই মর্মান্তিক ঘটনায় এখন পর্যন্ত প্রায় ৪০ জনের মৃত্যু নিশ্চিত করা হয়েছে এবং ১১৫ জন গুরুতর আহত হয়ে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
| বিষয় | বিবরণ |
|---|---|
| ঘটনাস্থল | লে কনস্টেলেশন পানশালা, ক্রানস মন্টানা, সুইজারল্যান্ড |
| সময় | রাত ১টা ৩০ মিনিট (নতুন বছরের প্রথম দিন) |
| নিহত | প্রায় ৪০ জন (অধিকাংশই তরুণ-তরুণী) |
| আহত | ১১৫ জন |
| উদ্ধারকারী সরঞ্জাম | ৪০টি অ্যাম্বুলেন্স, ১০টি হেলিকপ্টার ও বিশাল পুলিশ বাহিনী |
| শোকের মেয়াদ | ৫ দিন (জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত থাকবে) |
রাষ্ট্রীয় শোক ও বর্তমান পরিস্থিতি
সুইজারল্যান্ডের প্রেসিডেন্ট গায় পারমেলিন বৃহস্পতিবার দুর্ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। তিনি এই ঘটনাকে ‘জাতীয় ট্র্যাজেডি’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন। নিহতদের স্মরণে দেশটিতে পাঁচ দিনের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করা হয়েছে এবং জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। প্রেসিডেন্ট বলেন, “যে মুহূর্তটি আনন্দের হওয়ার কথা ছিল, তা আজ গভীর শোকে পরিণত হয়েছে। অনেক তরুণ তাদের স্বপ্ন ও আশা নিয়ে এখানে এসেছিল, যা মুহূর্তেই ধূলিসাৎ হয়ে গেল।”
বর্তমানে ফরেনসিক দল ঘটনাস্থলে আলামত সংগ্রহ করছে। পুলিশ স্পষ্টভাবে জানিয়েছে যে এটি কোনো নাশকতামূলক ঘটনা নয়, বরং একটি অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনা। ক্রানস মন্টানার রাজপথ এখন উৎসবের পোস্টারে ঢাকা থাকলেও সেখানে বিরাজ করছে এক গুমোট স্তব্ধতা। স্বজনের অপেক্ষায় থাকা পরিবারগুলোর কান্নায় ভারী হয়ে উঠেছে আল্পসের বাতাস।