খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: সোমবার, ১৩ এপ্রিল ২০২৬
সাত দশকেরও বেশি সময় ধরে হিন্দি ও বাংলা সংগীতের আকাশে যিনি ছিলেন এক অনন্য উজ্জ্বল নক্ষত্র, সেই আশা ভোঁসলের কণ্ঠ ছিল অসংখ্য শ্রোতার আবেগ, ভালোবাসা ও স্মৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। কঠিন রাগাশ্রিত সুর থেকে শুরু করে হালকা ধ্রুপদী ও চলচ্চিত্রের জনপ্রিয় গান—সব ক্ষেত্রেই তাঁর ছিল অদ্বিতীয় দখল। তিনি ছিলেন সত্যিকারের সুরের সম্রাজ্ঞী, যার কণ্ঠের জাদু প্রজন্মের পর প্রজন্মকে মুগ্ধ করেছে।
ছোটবেলা থেকেই তাঁর গান শুনে বড় হয়েছেন এক সংগীতশিল্পী, যার জীবনের সুরের ভিত গড়ে উঠেছে এই কিংবদন্তির কণ্ঠকে কেন্দ্র করে। দীর্ঘদিন ধরে তিনি শুধু ভক্তই ছিলেন না, ধীরে ধীরে গড়ে উঠেছিল এক আন্তরিক সম্পর্ক ও বন্ধুত্ব। তাই তাঁর অসুস্থতার খবর শোনার পর থেকেই মনে অজানা শঙ্কা ও উদ্বেগ কাজ করছিল। শেষ পর্যন্ত যখন তাঁর চলে যাওয়ার সংবাদ জানা গেল, তখন হৃদয়ের ভেতরটা যেন একেবারে ভেঙে পড়ল।
এই শিল্পী স্মরণ করেন, কিছুদিন আগেই তিনি আশার পরিবারের সদস্যের সঙ্গে কথা বলেছিলেন। তখন থেকেই জানা গিয়েছিল, তাঁর শারীরিক অবস্থা ভালো নয়। কিন্তু বিশ্বাস ছিল, তিনি সব বাধা জয় করে আবারও ফিরে আসবেন। কারণ, তিনি ছিলেন এমন এক মানুষ যিনি জীবনের প্রতিটি চ্যালেঞ্জ দৃঢ়তার সঙ্গে মোকাবিলা করেছেন।
তাদের প্রথম পরিচয় ঘটে ২০১২ সালে, যখন দুবাইয়ে বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তানের প্রতিযোগীদের নিয়ে একটি সংগীত প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। সেই মঞ্চে তিনি, আশা ভোঁসলে এবং রুনা লায়লা একসঙ্গে বিচারকের দায়িত্ব পালন করেন। সেখান থেকেই শুরু হয় পরিচয়, যা ধীরে ধীরে রূপ নেয় গভীর বন্ধুত্বে। শুটিংয়ের ফাঁকে আড্ডা, হাসি, গল্প—সব মিলিয়ে সেই সময়গুলো আজও স্মৃতিতে অমলিন হয়ে আছে।
পরবর্তী সময়ে যোগাযোগ আরও গভীর হয়। ২০১৯ সালে তাঁর সুরে একটি গানে কণ্ঠ দেন আশা ভোঁসলে, যা ছিল তাঁদের শিল্পী সম্পর্কের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। মাঝেমধ্যে তাঁদের মধ্যে কথা হতো, দেখা হতো, স্মৃতি ভাগাভাগি হতো। কিন্তু ব্যস্ততার মাঝে অনেক সময় ইচ্ছে থাকলেও নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষা করা সম্ভব হয়নি—যা এখন গভীর আক্ষেপের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তাদের সম্পর্কের কিছু গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত নিচে তুলে ধরা হলো—
| সময়কাল | ঘটনা | সম্পর্কের ধরণ |
|---|---|---|
| শৈশবকাল | আশা ভোঁসলের গান শোনা ও অনুপ্রেরণা | একতরফা অনুপ্রেরণা |
| ২০১২ | দুবাইয়ে প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠানে প্রথম সাক্ষাৎ | পেশাগত পরিচয় |
| পরবর্তী বছরগুলো | নিয়মিত যোগাযোগ ও সাক্ষাৎ | বন্ধুত্ব |
| ২০১৯ | সুরে গানে কণ্ঠদান | সৃজনশীল সহযোগিতা |
| সাম্প্রতিক সময় | অসুস্থতার খবর | উদ্বেগ ও শোক |
আশা ভোঁসলে শুধু একজন মহান শিল্পীই ছিলেন না, তিনি ছিলেন এক অসাধারণ মানবিক ব্যক্তিত্ব। যাঁর সঙ্গে যেই সম্পর্কই তৈরি হয়েছে, তিনি সবাইকে আপন করে নিতেন। তাঁর বিনয়, শ্রদ্ধাবোধ এবং আন্তরিক আচরণ তাঁকে আরও উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিল। সহশিল্পীদের প্রতি তাঁর সম্মানবোধ ছিল সত্যিই বিরল।
আজ তাঁর কথা স্মরণ করতে গিয়ে চোখের অশ্রু থামানো কঠিন হয়ে পড়ছে। মনে হচ্ছে, জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হঠাৎ করেই শেষ হয়ে গেছে। বিশ্বসংগীত হারিয়েছে এক অমূল্য কণ্ঠস্বর, আর ব্যক্তিগত জীবনে হারিয়ে গেছে এক প্রিয় বন্ধু।
এই শূন্যতা সহজে পূরণ হওয়ার নয়। স্মৃতিতে ভেসে উঠছে সেই সব কথোপকথন, সেই স্নেহময় মুহূর্ত, আর তাঁর কণ্ঠে উচ্চারিত আন্তরিক সম্বোধন। তাঁর আত্মার শান্তির জন্যই এখন একমাত্র প্রার্থনা।