খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: 30শে বৈশাখ ১৪৩২ | ১৩ই মে ২০২৫ | 1149 Dhu al-Hijjah 5
আশিক চৌধুরী বিডার চেয়ারম্যানের দায়িত্ব গ্রহণের পর বিনিয়োগ বিষয়ে একের পর এক প্রচারণামূলক কর্মকাণ্ডে বেশ উদ্যোগী হতে দেখা গেছে। বিশেষ করে বিনিয়োগ সম্মেলনে আশিক চৌধুরীর প্রাণবন্ত উপস্থাপনা দেশে বিদেশে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। চতুর্দিকে তাঁর প্রজ্ঞা মেধা দক্ষতা নিয়ে নেটিজনরা প্রশংসা করতে থাকে।
বিনিয়োগ সম্মেলনের শেষ দিকে অনেক গণমাধ্যমে বলা হয় ‘আশিক ম্যাজিকে’ বাংলাদেশে বড় বিনিয়োগের প্রত্যাশা। তবে বিনিয়োগের সরকারি পরিসংখ্যান বিবেচনায় নিয়ে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর মতামত, প্রকৃত বিনিয়োগে ‘আশিক ম্যাজিকে’র প্রতিফলন এখনো দৃশ্যমান হতে শুরু করেনি।
নিয়োগ পাওয়ার পর গত সাত মাসে দেশের বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়নে অনেক ধরনের কর্মযজ্ঞেও হাত দিয়েছেন আশিক চৌধুরী। তবে বিনিয়োগ অবকাঠামো গড়ে তোলার প্রচারণামূলক ওইসব কর্মকাণ্ডের প্রতিফলন প্রকৃত বিনিয়োগ আকৃষ্টে এখনো পর্যন্ত দৃশ্যমান নয়। বিনিয়োগকারীদের আগ্রহের সূচক হিসেবে বিডায় নিবন্ধিত বিনিয়োগ প্রস্তাবের সংখ্যা যেমন নিম্নমুখী, তেমনি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যে প্রত্যক্ষ বিদেশী বিনিয়োগের (এফডিআই) নিট প্রবাহও কমেছে। অন্যদিকে শিল্পের মূলধনি যন্ত্র আমদানিও নিম্নমুখী। সব মিলিয়ে বিনিয়োগ আকৃষ্টে চৌধুরী আশিকের প্রচারণা বা তৎপরতা যতটা আলোচিত হচ্ছে, প্রকৃত বিনিয়োগ পরিস্থিতি তার ঠিক বিপরীত।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যালান্স অব পেমেন্টের (বিওপি) পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, চলতি অর্থবছরের প্রথম নয় মাস জুলাই থেকে মার্চে এফডিআইয়ের নিট প্রবাহ ছিল ৮৬ কোটি ১০ লাখ ডলার। ২০২৩-২৪ অর্থবছরের একই সময়ে নিট এফডিআই প্রবাহ ছিল ১১৬ কোটি ৪০ লাখ ডলার। এ হিসেবে চলতি অর্থবছরের নয় মাসে এফডিআইয়ের নিট প্রবাহ কমেছে ২৬ শতাংশ।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের উইকলি সিলেকটেড ইকোনমিক ইন্ডিকেটরসের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম নয় মাস জুলাই থেকে মার্চে মূলধনি যন্ত্র আমদানির ঋণপত্র নিষ্পত্তি বা আমদানি বাবদ অর্থ পরিশোধ হয়েছে ১৫২ কোটি ১৫ লাখ ৫০ হাজার ডলারের। গত অর্থবছরের একই সময়ে ঋণপত্র নিষ্পত্তি হয়েছিল ২১৩ কোটি ৩৩ লাখ ডলারের। অর্থাৎ মূলধনি যন্ত্র আমদানি কমেছে ২৮ দশমিক ৬৮ শতাংশ।
বিনিয়োগ পরিস্থিতি নিয়ে বক্তব্য নিতে গত রোববার থেকে একাধিকবার চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুনের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তথ্য ও পরিসংখ্যান উল্লেখ করে নির্বাহী চেয়ারম্যান ও তার কার্যালয় বরাবর গতকাল লিখিত প্রশ্ন পাঠানো হয়।
গতকাল রাতে এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি। বিদ্যমান বিনিয়োগ পরিস্থিতি নিয়ে বক্তব্য জানতে এরপর যোগাযোগ করা হয় প্রতিমন্ত্রী পদমর্যাদায় অর্থ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকা প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ড. আনিসুজ্জামান চৌধুরীর সঙ্গে। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘সামগ্রিকভাবে বিনিয়োগের বিষয়গুলো অর্থনীতির ওপর নির্ভরশীল। এটা একটা সার্কুলার (বৃত্তাকার) ব্যাপার। অবজেকটিভলি দেখলে দেখা যাবে বাংলাদেশে বিদেশী ও দেশী বিনিয়োগের হার সবসময়ই কম ছিল।
বিনিয়োগের এ পরিস্থিতি নতুন নয়। আর বিনিয়োগের বিষয়গুলো সবসময় চলমান প্রক্রিয়ার অংশ। আগের সঙ্গে বর্তমান বিনিয়োগের তুলনা এখন ন্যায্য কিনা সে প্রশ্ন রয়ে যায়। দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ সময় সাপেক্ষ ব্যাপার। বিনিয়োগকারীরা অনেক ধরনের বিষয় চিন্তা করেন। বিনিয়োগ হঠাৎ করে বাড়ে না। অতিসম্প্রতি একটা বিনিয়োগ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়েছিল, সেখানে কিছু প্রতিশ্রুতি এসেছে, যেগুলো বাস্তবায়নে সময় লাগবে। এখন নানা ধরনের অনিশ্চয়তা রয়েছে। কয়েক দিনের জন্য একটা যুদ্ধও হয়ে গেছে। রোহিঙ্গাদের একটা ইস্যু রয়ে গেছে। সার্বিকভাবে একটা রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্য দিয়ে আমরা যাচ্ছি। বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়নে সম্প্রতি সরকার বেশকিছু উদ্যোগ নিয়েছে। এরপর পরিস্থিতি কী হয় তা দেখার জন্য সময় দিতে হবে।’
গত ১২ সেপ্টেম্বর বিডা ও বেজার নির্বাহী চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার চারদিন পর চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন সাক্ষাৎ করেন ফরেন ইনভেস্টরস চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এফআইসিসিআই) প্রতিনিধিদের সঙ্গে। সাক্ষাতে তিনি বলেন, ‘আমরা আশা করছি বিদেশী বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বর্তমান যেসব চ্যালেঞ্জ ও প্রতিবন্ধকতা রয়েছে তা আমরা দ্রুতই সমাধান করতে পারব।’
এ বছরের ১৯ জানুয়ারি এফডিআই হিটম্যাপ প্রকাশ করে বিডা। প্রকাশকালে আশিক চৌধুরী বলেন, ‘এফডিআই হিটম্যাপ শুধু একটি পরিকল্পনা নয়, বরং আমাদের ভবিষ্যৎ বিনিয়োগ প্রচেষ্টার জন্য একটি রূপরেখা। আমরা যেকোনো রোড শো, দ্বিপক্ষীয় বিনিয়োগ চুক্তি বা নীতিগত সহায়তা এ তথ্যনির্ভর বিশ্লেষণ অনুযায়ী পরিচালনা করব।’ ২৩ মার্চ বিনিয়োগ সম্মেলন আয়োজনের ঘোষণা দেন আশিক চৌধুরী। এপ্রিলে অনুষ্ঠিত সম্মেলনে অংশ নেন ৫০টি দেশের ৪১৫ প্রতিনিধি। সম্মেলন শেষে ৩ হাজার ১০০ কোটি টাকার বিনিয়োগ প্রস্তাব পাওয়া গেছে বলে জানান আশিক চৌধুরী।
স্থানীয় বিনিয়োগকারীরা জানিয়েছেন, দেশে অবস্থানরত বিদেশী রাষ্ট্রদূতদের সঙ্গে আলোচনায়ও বাংলাদেশের বিনিয়োগ পরিস্থিতি নিয়ে ইতিবাচক মনোভাব দেখা যাচ্ছে না। এক স্থানীয় বিনিয়োগকারী গত এপ্রিলে অনুষ্ঠিত বিনিয়োগ সম্মেলন নিয়ে এক রাষ্ট্রদূতের কাছে অভিমত জানতে চান। তার প্রশ্ন ছিল, ‘শেষ হওয়া বিনিয়োগ সম্মেলনে আপনার দেশ থেকে অনেক বিনিয়োগকারী অংশ নিয়েছিলেন, বিনিয়োগ বাস্তবায়নে তারা কত সময় নিতে পারেন?’ জবাবে সেই রাষ্ট্রদূত প্রথমেই বলেছেন, ‘রাজনৈতিক সরকার ছাড়া কোনো বিনিয়োগকারী বাংলাদেশে আসবে না।’ বাংলাদেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির যথেষ্ট উন্নতি হয়নি জানিয়ে সেই রাষ্ট্রদূত বলেন, ‘এখনো মব হচ্ছে।’
বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের (বিসিআই) সভাপতি আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী পারভেজ বলেন, ‘বিদেশী বিনিয়োগকারীরা বিনিয়োগের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়ার জন্য রাজনৈতিক সরকারের অপেক্ষায় রয়েছেন। এছাড়া বিনিয়োগ আকর্ষণ নির্ভর করে আকৃষ্ট করার ক্ষেত্রে কী ধরনের প্রস্তাব দেয়া হচ্ছে তার ওপর। বাংলাদেশের স্থানীয় বিনিয়োগকারীরাই বিনিয়োগে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না, এ পরিস্থিতিতে বিদেশীরা কীভাবে বিনিয়োগ করবেন?’
আমেরিকান চেম্বার অব কমার্স ইন বাংলাদেশের (অ্যামচেম) সভাপতি সৈয়দ এরশাদ আহমেদ বলেন, ‘এটা ঠিক যে তিনি (আশিক চৌধুরী) চেষ্টা করে যাচ্ছেন। আবার এটাও ঠিক যে এত তাড়াতাড়ি ফল পাওয়া যাবে না, সময় লাগবে। স্থানীয় বিনিয়োগের ক্ষেত্রে অর্থায়ন একটা বড় সমস্যা। এখন সবচেয়ে বড় কাজ হলো বিনিয়োগ আকর্ষণের কাঠামোটা তৈরি করা। এতে সময় লাগবেই। যেমন বিডার বর্তমান নির্বাহী চেয়ারম্যান লজিস্টিককে গুরুত্ব দিচ্ছেন। এটা ইতিবাচক কিন্তু এটা অনেক আগে থেকেই দরকার ছিল। বিনিয়োগের জন্য যে সামগ্রিক সমন্বয় ও সক্ষমতার প্রয়োগ দরকার, সেটা এতদিন হচ্ছিল না, যা মাত্র শুরু হয়েছে। এ বিষয়গুলো যথাযথভাবে নিশ্চিত করতে পারলে হয়তো বিনিয়োগ আসবে। নতুন নির্বাহী চেয়ারম্যান আসার পর তিন-চার মাস লেগেছে সামগ্রিক পরিস্থিতি বুঝতে। প্রথমে তিনি চ্যালেঞ্জ চিহ্নিত করেছেন। এখন সেগুলো অ্যাড্রেস করা শুরু করেছেন। এগুলো ঠিকমতো অ্যাড্রেস করতে পারলে হয়তো ছয় মাস পর আমরা ইতিবাচক কিছু পাব।’
অর্থনীতির বিশ্লেষকরাও প্রায় একই ধরনের কথা বলছেন। তাদের মতে, বিদেশী বিনিয়োগ অনেক বিষয়ের ওপর নির্ভর করে। বিদেশী বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ এত বছরেও যখন সাফল্য দেখাতে পারেনি, খুব দ্রুত বা রাতারাতি পরিবর্তন আশা করাটা ঠিক না। আরো বেশকিছু কাজ আছে যেগুলো করা দরকার। দেশী বিনিয়োগ যে কারণে আটকে আছে একই কারণ বিদেশী বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। বর্তমানে দেশে এক ধরনের রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা চলছে—যেমন এ সরকার কতদিন থাকবে অথবা আগামী নির্বাচন কবে হবে, একটা নির্বাচিত সরকার কবে আসবে। এখন যে সংস্কার কর্মসূচিগুলো নেয়া হচ্ছে, পরবর্তী সরকার সেগুলো রক্ষা করবে কিনা। নীতির ক্ষেত্রে কোনো পরিবর্তন হবে কিনা। সবকিছু মিলিয়ে যখনই কোনো অনিশ্চিত অবস্থা থাকে তখন যত উদ্যোগই নেয়া হোক বিনিয়োগকারীরা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করেন। দেশী বিনিয়োগকারীর চেয়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা থাকে বিদেশীদের। ফলে তাদের লগ্নি করা বিনিয়োগ যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হয় সে বিষয়ে নিশ্চিত হতে চান বিদেশীরা। দেশী ও বিদেশী দুই ধরনের বিনিয়োগের পরিস্থিতিই এখন নাজুক।
সূত্র: বণিক বার্তা
খবরওয়ালা/এমএজেড