বিদ্যুৎ, গ্যাস ও পানির মতো মৌলিক রাষ্ট্রীয় পরিষেবা ছাড়া আধুনিক জীবনের কথা কল্পনাই করা যায় না। গ্রাম কিংবা শহর—সবখানেই এসব পরিষেবা দৈনন্দিন জীবনযাত্রার অবিচ্ছেদ্য অংশ। তবে নির্ধারিত সময়ে আয়কর রিটার্ন জমা না দিলে এসব পরিষেবার সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার ক্ষমতা এখন কর কর্মকর্তাদের হাতে রয়েছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) আওতাধীন আয়কর আইন অনুযায়ী এই ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে, যা কর পরিপালনে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
২০২৫–২৬ অর্থবছরের জন্য প্রণীত আয়কর নির্দেশিকায় স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে রিটার্ন জমা না দিলে কর কর্মকর্তারা পাঁচ ধরনের ব্যবস্থা নিতে পারবেন। এর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত ও কঠোর ব্যবস্থা হলো বিদ্যুৎ, গ্যাস, পানি কিংবা অন্য যেকোনো রাষ্ট্রীয় পরিষেবা সংযোগ সাময়িক বা স্থায়ীভাবে বিচ্ছিন্ন করা। উদ্দেশ্য একটাই—করদাতাদের নিয়মিত রিটার্ন দাখিলে বাধ্য করা এবং কর নেট সম্প্রসারণ করা।
রিটার্ন না দিলে সম্ভাব্য আইনগত ব্যবস্থা
| ব্যবস্থা | আইনি ভিত্তি | সংক্ষিপ্ত বিবরণ |
|---|---|---|
| জরিমানা আরোপ | আয়কর আইন, ধারা ২৬৬ | নির্ধারিত করের শতাংশ বা নির্দিষ্ট অঙ্কে জরিমানা |
| কর অব্যাহতি হ্রাস | ধারা ১৭৪ | বিনিয়োগজনিত কর রেয়াতসহ সুবিধা বাতিল |
| অতিরিক্ত কর | প্রাসঙ্গিক বিধান | প্রতি মাসে ২% হারে অতিরিক্ত কর |
| পরিষেবা সংযোগ বিচ্ছিন্ন | আয়কর আইন | বিদ্যুৎ, গ্যাস, পানি ইত্যাদি বন্ধ |
| বেতন–ভাতায় জটিলতা | প্রশাসনিক নির্দেশনা | চাকরিজীবীদের বেতন পরিশোধে বাধা |
আইন অনুযায়ী, রিটার্ন জমা না দিলে জরিমানার পরিমাণ করদাতার পূর্ববর্তী কর ইতিহাসের ওপর নির্ভর করে। যাঁদের আগে কখনো কর নির্ধারণ হয়নি, তাঁদের জন্য নির্দিষ্ট অঙ্কের জরিমানা আরোপ করা হয়। আর যাঁদের আগে কর নির্ধারণ হয়েছে, তাঁদের ক্ষেত্রে সর্বশেষ নিরূপিত আয়ের ওপর ধার্য করের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ জরিমানা হিসেবে আরোপ হতে পারে। পাশাপাশি, বিলম্ব অব্যাহত থাকলে প্রতিদিনের জন্য অতিরিক্ত জরিমানাও যোগ হয়।
রিটার্ন না দেওয়ার আরেকটি বড় ক্ষতি হলো কর অব্যাহতি ও রেয়াত হারানোর ঝুঁকি। সময়মতো রিটার্ন না দিলে বিনিয়োগজনিত কর রেয়াত, কর অবকাশ কিংবা অন্যান্য কর সুবিধা বাতিল হতে পারে। ফলে করদাতার মোট করভার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যেতে পারে।
এ ছাড়া নির্ধারিত সময়ে রিটার্ন জমা না দিলে প্রতি মাসে আরোপিত করের ওপর অতিরিক্ত কর দিতে হয়, যা দীর্ঘমেয়াদে বড় অঙ্কে পৌঁছাতে পারে। সরকারি ও বেসরকারি চাকরিজীবীদের ক্ষেত্রে রিটার্ন জমা না দিলে বেতন–ভাতা উত্তোলন বা অন্যান্য আর্থিক সুবিধা পেতেও জটিলতা দেখা দিতে পারে।
কারা রিটার্ন দিতে বাধ্য
দুই শ্রেণির কর শনাক্তকরণ নম্বরধারীদের অবশ্যই আয়কর রিটার্ন জমা দিতে হয়। এক, যাঁদের বার্ষিক করযোগ্য আয় সাড়ে তিন লাখ টাকার বেশি। দুই, যাঁদের আয়কর রিটার্ন দেওয়া আইনগতভাবে বাধ্যতামূলক, যদিও তাঁদের আয় করসীমার নিচে থাকে। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, প্রায় ৩৯ ধরনের সরকারি ও বেসরকারি সেবা গ্রহণের ক্ষেত্রে আয়কর রিটার্নের প্রমাণপত্র দেখাতে হয়।
বর্তমানে দেশে প্রায় ১ কোটি ১৫ লাখ টিআইএনধারী রয়েছেন। এর মধ্যে এখন পর্যন্ত প্রায় ৩১ লাখ করদাতা তাঁদের রিটার্ন জমা দিয়েছেন। এনবিআরের কর্মকর্তারা মনে করছেন, কঠোর এই বিধান বাস্তবায়িত হলে রিটার্ন দাখিলের হার আরও বাড়বে এবং কর ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা জোরদার হবে।