খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ৩ মার্চ ২০২৬
মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে এক প্রলয়ঙ্কারী অধ্যায়ের সূচনা হয়েছে। ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির মৃত্যু এবং পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ পুরো অঞ্চলকে একটি বৃহত্তর যুদ্ধের মুখে ঠেলে দিয়েছে। তেহরানে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের নজিরবিহীন বিমান হামলার জবাবে ইরান ও তার মিত্র শক্তিগুলোও পাল্টা আঘাত হানছে। এই সংঘাত এখন আর কেবল দুই দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, বরং লেবানন থেকে শুরু করে পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলো পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে।
গত শনিবার শুরু হওয়া এই ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ (যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া নাম) এবং ‘লায়ন রোর’ (ইসরায়েলের দেওয়া নাম) আজ চতুর্থ দিনে পদার্পণ করেছে। রয়টার্স ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের তথ্যমতে, গত তিন দিনে ইরান ও ইসরায়েল ছাড়াও লেবানন, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, কুয়েত, বাহরাইন, জর্ডান এবং ওমানে মিসাইল ও ড্রোন হামলা হয়েছে। এমনকি ভূমধ্যসাগরীয় দ্বীপ রাষ্ট্র সাইপ্রাসে অবস্থিত ব্রিটিশ ঘাঁটিও এই আগুনের আঁচ থেকে রক্ষা পায়নি।
ইরানি রেড ক্রিসেন্টের তথ্য অনুযায়ী, চলমান হামলায় ইরানে এ পর্যন্ত অন্তত ৫৫৫ জন প্রাণ হারিয়েছেন। এর মধ্যে একটি বালিকা বিদ্যালয়ে হামলায় ১৮০ জন শিক্ষার্থীর মৃত্যু বিশ্বজুড়ে শোকের ছায়া ফেলেছে। অন্যদিকে, ইরানের পাল্টা হামলায় ইসরায়েলে ১০ জন এবং কুয়েতে ৪ জন মার্কিন সেনা নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।
এই যুদ্ধ কেবল প্রাণহানিই ঘটাচ্ছে না, বরং বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারেও অস্থিরতা তৈরি করেছে। সৌদি আরামকোর তেল শোধনাগার এবং কাতার এনার্জির গ্যাস স্থাপনায় হামলার পর বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম লাফিয়ে বাড়ছে।
| দেশ/অঞ্চল | নিহতের সংখ্যা (আনুমানিক) | প্রধান ক্ষয়-ক্ষতি/ঘটনা |
| ইরান | ৫৫৫ জন | নাতাঞ্জ ও ইসফাহান পরমাণু স্থাপনা এবং আইআরজিসি সদর দপ্তরে হামলা। |
| ইসরায়েল | ১০ জন | প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন ও কার্যালয় লক্ষ্য করে ড্রোন হামলা। |
| যুক্তরাষ্ট্র (সেনা) | ৪ জন | কুয়েত ও ইরাকে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটিতে হামলা এবং ৩টি এফ-১৫ বিমান বিধ্বস্ত। |
| লেবানন | ৫২ জন | বৈরুতে ইসরায়েলি বিমান হামলায় হিজবুল্লাহর গোয়েন্দা প্রধান নিহত। |
| উপসাগরীয় দেশ | ৭ জন | তেল ট্যাংকার ও শোধনাগারে হামলা (নিহতদের মধ্যে ২ জন বাংলাদেশি)। |
রাজধানী তেহরান এখন এক বিধ্বস্ত নগরী। ইসরায়েলি বাহিনী দাবি করেছে, তারা গত তিন দিনে ইরানের ১৩১টি শহরে হামলা চালিয়েছে। বিশেষ করে তেহরানের রেভোল্যুশন স্কয়ার ও নিলোফার স্কয়ারে ভয়াবহ বোমাবর্ষণে সাধারণ মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে। পেন্টাগন দাবি করেছে যে, তাদের হামলায় ইরানের অন্তত ৪৯ জন শীর্ষস্থানীয় নেতা নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে খামেনির স্ত্রী মানসুরেহ খোজাস্তেহর মৃত্যুর খবরটি শোকের মাত্রাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন যে, এই যুদ্ধ চার থেকে পাঁচ সপ্তাহ স্থায়ী হতে পারে এবং প্রয়োজনে এর মেয়াদ আরও বাড়ানো হবে। তবে যুক্তরাষ্ট্রে এই যুদ্ধের জনপ্রিয়তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। রয়টার্স-ইপসস জরিপে দেখা গেছে, মাত্র এক-তৃতীয়াংশ মার্কিন নাগরিক এই হামলাকে সমর্থন করছেন। অন্যদিকে, ইরানের শীর্ষ কর্মকর্তা আলী লারি জানি সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, যুদ্ধের এই পরিস্থিতিতে ওয়াশিংটনের সাথে কোনো আলোচনার সুযোগ নেই।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ট্রিটা পারসির মতে, ট্রাম্পের কৌশল ছিল শীর্ষ নেতাদের হত্যা করে ইরানকে নতি স্বীকারে বাধ্য করা। কিন্তু তেহরানের কাছে আত্মসমর্পণের চেয়ে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়াকেই টিকে থাকার শ্রেয়তর পথ মনে হচ্ছে। ফলে মধ্যপ্রাচ্যের এই আগুন অদূর ভবিষ্যতে নেভার সম্ভাবনা ক্ষীণ।