খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ৫ মার্চ ২০২৬
রাজধানীতে সুন্নতে খতনা করাতে গিয়ে শিশু আয়ান আহমেদের মৃত্যুর ঘটনায় দুই চিকিৎসকের নিবন্ধন ছয় মাসের জন্য স্থগিত করেছে বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিল (বিএমডিসি)। চিকিৎসা-সংক্রান্ত অভিযোগের তদন্ত ও দীর্ঘ শুনানি শেষে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। নিবন্ধন স্থগিত হওয়া দুই চিকিৎসক হলেন অ্যানেসথেসিয়া বিশেষজ্ঞ ডা. সৈয়দ সাব্বির আহমেদ এবং সার্জন ডা. তাসনুভা মাহজাবীন।
বিএমডিসির রেজিস্ট্রার ডা. লিয়াকত হোসেন জানান, কাউন্সিলের ৫৪তম সভায় বিষয়টি বিস্তারিতভাবে পর্যালোচনা করা হয়। তদন্ত প্রতিবেদনের আলোকে সিদ্ধান্ত হয় যে, ডা. সৈয়দ সাব্বির আহমেদের বিরুদ্ধে চিকিৎসা কার্যক্রমে গুরুতর অভিযোগের প্রমাণ পাওয়া গেছে। এ কারণে বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিল আইন ২০১০–এর ধারা ২৩(১) এবং বিএমডিসি প্রবিধানমালা ২০২২–এর বিধান ৩৬(৪)(খ) অনুযায়ী তাঁর নিবন্ধন সাময়িকভাবে বাতিল করে ছয় মাসের জন্য স্থগিত করা হয়েছে।
অন্যদিকে, সার্জন ডা. তাসনুভা মাহজাবীনের ক্ষেত্রে চিকিৎসায় সরাসরি অবহেলার প্রমাণ না মিললেও পেশাগত আচরণে ঘাটতির বিষয়টি উঠে আসে। ফলে একই সময়ের জন্য তাঁর নিবন্ধনও স্থগিত করার সিদ্ধান্ত নেয় কাউন্সিল।
বিএমডিসির বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, আইন অনুযায়ী নিবন্ধন স্থগিত থাকার সময় এই দুই চিকিৎসক বাংলাদেশের কোথাও চিকিৎসা পেশায় যুক্ত থাকতে পারবেন না। এমনকি নিজেকে চিকিৎসক হিসেবে পরিচয় দেওয়াও তাঁদের জন্য নিষিদ্ধ থাকবে। এই নিষেধাজ্ঞা চলতি বছরের ৩ মার্চ থেকে কার্যকর হয়েছে।
ঘটনার সূত্রপাত ২০২৩ সালের ৩০ ডিসেম্বর। ওই দিন রাজধানীর বাড্ডা এলাকার সাঁতারকুলে অবস্থিত ইউনাইটেড মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ছেলে আয়ানকে নিয়ে যান তাঁর বাবা শামীম আহমেদ। শিশুটির সুন্নতে খতনার আগে তাকে অ্যানেসথেসিয়া দেওয়া হয়। পরিবারের সদস্যদের জানানো হয়েছিল, আধা ঘণ্টার মধ্যেই সে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসবে।
কিন্তু নির্ধারিত সময় পার হলেও আয়ানের জ্ঞান ফেরেনি। একপর্যায়ে অবস্থার অবনতি হলে তাকে একই প্রতিষ্ঠানের গুলশান-২ এলাকার ইউনাইটেড হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। সেখানে পেডিয়াট্রিক ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটে (পিআইসিইউ) চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৩১ ডিসেম্বর রাত ১১টা ২০ মিনিটে তাকে মৃত ঘোষণা করেন চিকিৎসকেরা।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তখন জানায়, শিশুটির ফুসফুসে বাতাস জমে যাওয়ার কারণে কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট হয়। এর ফলে হৃদ্যন্ত্র, কিডনি ও লিভারসহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ বিকল হয়ে যায়, যাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় মাল্টি অর্গান ফেলিউর বলা হয়।
ঘটনাটি দেশজুড়ে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয় এবং দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থার মান ও নিরাপত্তা নিয়ে নানা প্রশ্ন ওঠে। পরবর্তীতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর চার সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। পাশাপাশি আয়ানের পরিবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় এবং বিএমডিসিতে অভিযোগ দায়ের করে। পরে সংশ্লিষ্ট দুই চিকিৎসকের বিরুদ্ধে মামলাও করা হয়।
দীর্ঘ তদন্ত, শুনানি এবং প্রমাণ পর্যালোচনার পর বিএমডিসি শেষ পর্যন্ত দুই চিকিৎসকের নিবন্ধন ছয় মাসের জন্য স্থগিত করার সিদ্ধান্ত নেয়। স্বাস্থ্য খাতের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করছেন, এই সিদ্ধান্ত চিকিৎসা পেশায় জবাবদিহি নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ একটি পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হবে।
ঘটনার গুরুত্বপূর্ণ তথ্যসংক্ষেপ
| বিষয় | তথ্য |
|---|---|
| শিশুর নাম | আয়ান আহমেদ |
| ঘটনার তারিখ | ৩০ ডিসেম্বর ২০২৩ |
| মৃত্যুর সময় | ৩১ ডিসেম্বর রাত ১১:২০ |
| সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক | ডা. সৈয়দ সাব্বির আহমেদ, ডা. তাসনুভা মাহজাবীন |
| শাস্তির ধরন | চিকিৎসক নিবন্ধন ৬ মাসের জন্য স্থগিত |
| কার্যকর হওয়ার তারিখ | ৩ মার্চ |
এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানে নিরাপদ অ্যানেসথেসিয়া প্রয়োগ, শিশুদের সার্জিক্যাল সেবা এবং চিকিৎসকদের পেশাগত দায়িত্ব পালনের বিষয়ে আরও কঠোর নজরদারির প্রয়োজনীয়তা নতুন করে সামনে এসেছে বলে মনে করছেন স্বাস্থ্য খাতের বিশেষজ্ঞরা।