খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: 6শে বৈশাখ ১৪৩৩ | ১৯ই এপ্রিল ২০২৬ | 1150 Dhu al-Hijjah 5
ফেনীর সোনাগাজীতে সম্প্রতি ইউটিউব ভিডিও দেখে ঘরে বসে ‘অকটেন তৈরির চেষ্টা’ করতে গিয়ে এক ব্যবসায়ীর মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। এই ঘটনাটি জনমনে একটি বড় প্রশ্ন তৈরি করেছে—আসলেই কি ঘরোয়া পরিবেশে বা সাধারণ কোনো পদ্ধতিতে অকটেন উৎপাদন করা সম্ভব? জ্বালানি বিশেষজ্ঞ এবং বৈজ্ঞানিক গবেষণার তথ্য বিশ্লেষণ করলে এর উত্তর পাওয়া যায় অত্যন্ত স্পষ্টভাবে: না, এটি কোনোভাবেই সম্ভব নয় এবং অত্যন্ত জীবনঘাতী।
অকটেন মূলত পেট্রোলিয়ামের একটি হাইড্রোকার্বন উপাদান। এটি উৎপাদিত হয় তেল শোধনাগারে (রিফাইনারি) অত্যন্ত জটিল এবং নিয়ন্ত্রিত শিল্প প্রক্রিয়ার মাধ্যমে। অপরিশোধিত তেল বা ক্রুড অয়েল থেকে অকটেন পৃথক করতে ‘ফ্র্যাকশনাল ডিস্টিলেশন’ বা আংশিক পাতন এবং ‘ক্যাটালিটিক রিফর্মিং’-এর মতো উন্নত প্রযুক্তির প্রয়োজন হয়।
জার্নাল অব ক্যাটালাইসিস-এর তথ্যমতে, অকটেন তৈরির প্রক্রিয়ায় যেসব এনজাইম এবং ক্যাটালিস্ট (অনুঘটক) ব্যবহৃত হয়, সেগুলোর কার্যকারিতা নির্দিষ্ট উচ্চ চাপ ও তাপমাত্রার ওপর নির্ভর করে। এই পরিবেশ শুধুমাত্র শিল্পকারখানায় বিশেষায়িত যন্ত্রপাতির মাধ্যমেই নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। সাধারণ ঘরোয়া চুলা বা ড্রাম ব্যবহার করে এই স্তরের তাপমাত্রা এবং চাপ বজায় রাখা বৈজ্ঞানিকভাবে অসম্ভব।
নিচে একটি টেবিলের মাধ্যমে শিল্পকারখানায় অকটেন উৎপাদন এবং ঘরোয়া অপচেষ্টার পার্থক্য দেখানো হলো:
| বিষয় | শিল্পকারখানা (রিফাইনারি) | ঘরোয়া পরিবেশ/অপচেষ্টা |
| প্রযুক্তি | উন্নত ফ্র্যাকশনাল ডিস্টিলেশন কলাম এবং ক্যাটালিটিক ইউনিট। | সাধারণ পাত্র, ড্রাম বা প্লাস্টিকের পাইপ। |
| তাপমাত্রা ও চাপ | স্বয়ংক্রিয় নিয়ন্ত্রিত উচ্চ তাপমাত্রা ও উচ্চ বায়ুমন্ডলীয় চাপ। | অনিয়ন্ত্রিত তাপ, যা যেকোনো সময় বিস্ফোরণ ঘটাতে পারে। |
| নিরাপত্তা ব্যবস্থা | ফায়ার সাপ্রেশন সিস্টেম এবং কঠোর সুরক্ষা প্রটোকল। | কোনো প্রকার সুরক্ষা সরঞ্জাম বা অগ্নিনির্বাপক ব্যবস্থা নেই। |
| বিশুদ্ধতা | ইঞ্জিনের ক্ষতি রোধে ৯৫% বা তার বেশি বিশুদ্ধতা নিশ্চিতকরণ। | অত্যন্ত নিম্নমানের ও ক্ষতিকর রাসায়নিক মিশ্রণ। |
| ফলাফল | বাণিজ্যিক ব্যবহারের উপযোগী উচ্চমানের জ্বালানি। | প্রাণহানি, অগ্নিকাণ্ড ও পরিবেশ দূষণ। |
জ্বালানি তেলের বাষ্পীভূত হওয়ার হার অত্যন্ত বেশি এবং এর ‘ফ্ল্যাশ পয়েন্ট’ (যেই তাপমাত্রায় বাষ্প জ্বলে ওঠে) অনেক নিচে। জার্নাল অব লস প্রিভেনশন ইন দ্য প্রসেসেস ইন্ডাস্ট্রিজ-এ প্রকাশিত গবেষণায় বলা হয়েছে, অনিয়ন্ত্রিত পরিবেশে হাইড্রোকার্বন পাতন করা একটি আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত। সামান্যতম ভুল বা তেলের বাষ্পের সাথে বাতাসের অক্সিজেনের সংমিশ্রণ থেকে মুহূর্তের মধ্যে বিশাল বিস্ফোরণ ঘটতে পারে।
এছাড়া, এই প্রক্রিয়ায় স্বাস্থ্যের ওপর মারাত্মক প্রভাব পড়ে। এনভারমেন্টাল হেলথ পারসপেকটিভস জার্নাল অনুযায়ী, অপরিশোধিত হাইড্রোকার্বন বাষ্প ফুসফুসের কোষের দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতি করে এবং সরাসরি কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রকে (কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্র) আঘাত করতে পারে। মাস্ক বা সাধারণ কাপড় ব্যবহার করে এই বিষাক্ত বাষ্প থেকে সুরক্ষা পাওয়া সম্ভব নয়।
বৈজ্ঞানিক গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে যে, যদি কেউ কোনোভাবে একটি তরল তৈরিও করে যা দাহ্য, সেটি অকটেনের সমতুল্য নয়। জ্বালানির রাসায়নিক শুদ্ধতা নিশ্চিত না হলে তা আধুনিক ইঞ্জিনের অভ্যন্তরীণ দহন ক্ষমতা (অভ্যন্তরীণ দহন) নষ্ট করে দেয়। এর ফলে ইঞ্জিন নক (Knocking) হয়ে স্থায়ীভাবে অকেজো হয়ে যেতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ইউটিউব বা সোশ্যাল মিডিয়ায় দেখানো ঘরোয়া পদ্ধতিগুলো মূলত অপবিজ্ঞান। অনেক ক্ষেত্রে ভিডিওর ভিউ বাড়ানোর জন্য ক্লিকবেইট বা বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রচার করা হয়। সাধারণ মানুষ যথাযথ বৈজ্ঞানিক জ্ঞান ছাড়াই এই পরীক্ষাগুলো করতে গিয়ে ফেনীর সোনাগাজীর ঘটনার মতো ভয়াবহ দুর্ঘটনার শিকার হন। বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে, কোনো হাইটেক ল্যাবরেটরি বা রিফাইনারি ছাড়া বাড়িতে অকটেন তৈরি করা কেবল অবাস্তবই নয়, বরং এটি একটি সুনিশ্চিত মৃত্যুফাঁদ। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ হলো, এই ধরনের কোনো বিপজ্জনক এবং অবৈজ্ঞানিক কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থাকা।