খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: শনিবার, ৭ মার্চ ২০২৬
বাংলা জাতির মুক্তিসংগ্রামের ইতিহাসে সাত মার্চ এক অবিস্মরণীয় দিন। উনিশশো একাত্তর সালের এই দিনে বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঢাকার রমনা রেসকোর্স ময়দানে এক ঐতিহাসিক ভাষণ প্রদান করেন। সেই ভাষণ বাঙালি জাতিকে স্বাধীনতার পথে অগ্রসর হওয়ার সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা দেয় এবং পরবর্তী মুক্তিযুদ্ধের রাজনৈতিক ভিত্তি স্থাপন করে। আজকের দিনে ফিরে তাকালে স্পষ্ট হয়, সাত মার্চের সেই ভাষণ শুধু একটি রাজনৈতিক বক্তব্য ছিল না; বরং তা ছিল একটি জাতির আত্মমর্যাদা ও মুক্তির আকাঙ্ক্ষার জাগরণধ্বনি।
সেদিন ঢাকার রমনা রেসকোর্স ময়দান পরিণত হয়েছিল মানুষের মহাসমুদ্রে। দেশের বিভিন্ন জেলা, শহর ও গ্রাম থেকে অসংখ্য মানুষ নানা উপায়ে সেখানে সমবেত হন। কেউ হেঁটে, কেউ নৌযানে, কেউ বা বাস কিংবা ট্রেনে করে রাজধানীতে পৌঁছান। ধর্ম, বর্ণ কিংবা পেশাগত বিভেদ ভুলে লাখো মানুষের একত্র সমাবেশ ইতিহাসে বিরল এক দৃশ্যের সৃষ্টি করেছিল। সবার লক্ষ্য ছিল একটাই—বঙ্গবন্ধুর কণ্ঠে জাতির ভবিষ্যৎ সংগ্রামের আহ্বান শোনা।
বিকেল প্রায় তিনটা বিশ মিনিটে সাদা পায়জামা-পাঞ্জাবি ও কালো হাতাকাটা কোট পরিহিত বঙ্গবন্ধু দৃপ্ত পদক্ষেপে মঞ্চে উপস্থিত হন। মুহূর্তেই চারদিক মুখর হয়ে ওঠে স্লোগান ও করতালিতে। তিনি জনতার উদ্দেশে হাত নেড়ে শুভেচ্ছা জানান এবং শুরু করেন তাঁর ঐতিহাসিক ভাষণ। প্রায় আঠারো মিনিটের সেই ভাষণে তিনি বাঙালির রাজনৈতিক অধিকার, আত্মমর্যাদা ও স্বাধীনতার প্রশ্নে স্পষ্ট অবস্থান তুলে ধরেন।
ভাষণের এক পর্যায়ে তিনি দৃপ্ত কণ্ঠে উচ্চারণ করেন—
“এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।”
এই ঘোষণাই বাঙালি জাতির মুক্তির আকাঙ্ক্ষাকে সুসংগঠিত সংগ্রামে রূপ দেয়। বঙ্গবন্ধু একই সঙ্গে চারটি গুরুত্বপূর্ণ দাবি উত্থাপন করেন—সামরিক আইন প্রত্যাহার, সৈন্যদের ব্যারাকে প্রত্যাবর্তন, গণহত্যায় নিহতদের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ প্রদান এবং নির্বাচিত প্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর।
নিচের সারণিতে সাত মার্চের ভাষণের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো—
| বিষয় | বিবরণ |
|---|---|
| তারিখ | সাত মার্চ উনিশশো একাত্তর |
| স্থান | রমনা রেসকোর্স ময়দান, ঢাকা |
| বক্তা | বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান |
| ভাষণের দৈর্ঘ্য | প্রায় আঠারো মিনিট |
| প্রধান বার্তা | মুক্তি ও স্বাধীনতার সংগ্রামের আহ্বান |
| ঐতিহাসিক ফলাফল | মুক্তিযুদ্ধের রাজনৈতিক ভিত্তি সুদৃঢ় |
সেদিন ভাষণটি সরাসরি প্রচারের উদ্যোগ নেওয়া হলেও সামরিক কর্তৃপক্ষ তা সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেয়। প্রতিবাদস্বরূপ বেতারের বাঙালি কর্মীরা সম্প্রচার বন্ধ করে দেন। পরে গভীর রাতে ভাষণটি সম্পূর্ণ আকারে প্রচারের অনুমতি দেওয়া হয়। এরপর তা দ্রুত দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে এবং মানুষের মধ্যে স্বাধীনতার প্রত্যয় আরও দৃঢ় করে।
সাত মার্চের ভাষণ বাঙালি জাতির ইতিহাসে এক অনন্য দলিল। এই ভাষণের অনুপ্রেরণায় জনগণ মুক্তিযুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হয়। পরবর্তীতে পঁচিশ মার্চের নির্মম গণহত্যার পর ছাব্বিশ মার্চের প্রথম প্রহরে স্বাধীনতার ঘোষণা আসে এবং শুরু হয় দীর্ঘ নয় মাসের সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ। অসংখ্য শহীদের আত্মত্যাগ ও মানুষের অদম্য সাহসের মধ্য দিয়ে অবশেষে ষোল ডিসেম্বর অর্জিত হয় বিজয় এবং প্রতিষ্ঠিত হয় স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ।
এই ভাষণ আজ আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও বিশেষ মর্যাদাপ্রাপ্ত। দুই হাজার সতেরো সালের ত্রিশ অক্টোবর জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতিবিষয়ক সংস্থা ভাষণটিকে বিশ্ব প্রামাণ্য ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। এর মধ্য দিয়ে ভাষণটির ঐতিহাসিক গুরুত্ব বিশ্বব্যাপী স্বীকৃতি লাভ করে।
আওয়ামীলীগ কেন্দ্রীয় ভাবে কোনো কর্মসূচি পালন না করলেও ঢাকা সহ দেশের বিভিন্ন জেলায় মিছিল, পোষ্টারিং ও মাইক লাগিয়ে ৭মার্চের সেই ঐতিহাসিক ভাষন প্রচার করেন। বিশেষ করে সেচ্ছাসেবকলীগ ঢাকা শহরের বিভিন্ন স্থানে ৭ই মার্চ উপলক্ষে পোষ্টারিং ও আজ মাইক লাগিয়ে ভাষন টি প্রচার করে।