খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: 22শে ফাল্গুন ১৪৩২ | ৬ই মার্চ ২০২৬ | 1150 Dhu al-Hijjah 5
কুষ্টিয়ার ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে (ইবি) নিজ দপ্তরে সমাজকল্যাণ বিভাগের সভাপতি ও সহকারী অধ্যাপক আসমা সাদিয়া রুনা হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে এসেছে। দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ এবং বিভাগীয় অর্থ আত্মসাতের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ানোয় দুই শিক্ষক ও এক কর্মকর্তার সরাসরি পরিকল্পনায় এই হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। বুধবার দিবাগত রাতে নিহত আসমার স্বামী মুহা. ইমতিয়াজ সুলতান ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় থানায় চারজনকে আসামি করে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেছেন।
মামলার এজাহার অনুযায়ী, এই হত্যাকাণ্ডের মূল পরিকল্পনাকারী হিসেবে আসমা সাদিয়ারই দুই সহকর্মী এবং এক প্রশাসনিক কর্মকর্তাকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। তাদের নির্দেশে কর্মচারী খন্দকার ফজলুর রহমান সরাসরি ছুরিকাঘাত করে হত্যাকাণ্ড সম্পন্ন করেন বলে দাবি করা হয়েছে।
| আসামির নাম | পদবী ও কর্মস্থল | মামলায় ভূমিকা |
| খন্দকার ফজলুর রহমান | কর্মচারী, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ (সাবেক সমাজকল্যাণ বিভাগ) | প্রধান আসামি (সরাসরি হত্যাকারী) |
| শ্যাম সুন্দর সরকার | সহকারী অধ্যাপক, সমাজকল্যাণ বিভাগ | পরিকল্পনা ও প্ররোচনা প্রদানকারী |
| হাবিবুর রহমান | সহকারী অধ্যাপক, সমাজকল্যাণ বিভাগ | পরিকল্পনা ও প্ররোচনা প্রদানকারী |
| বিশ্বজিৎ কুমার বিশ্বাস | সহকারী রেজিস্ট্রার, আয়েশা সিদ্দিকা হল | পরিকল্পনা ও প্ররোচনা প্রদানকারী |
মামলার এজাহার এবং সংশ্লিষ্টদের তথ্যানুযায়ী, আসমা সাদিয়া ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসে বিভাগের সভাপতি হওয়ার পর থেকেই দুর্নীতির বিরুদ্ধে আপসহীন অবস্থান নেন। সমাজকল্যাণ বিভাগের সাবেক সভাপতি শ্যাম সুন্দর সরকার এবং সহকারী রেজিস্ট্রার বিশ্বজিৎ কুমারের বিরুদ্ধে বিভাগীয় অর্থ অপব্যবহারের অভিযোগ ওঠে। আসমা স্বচ্ছতার ভিত্তিতে কাজ করতে চাইলে আসামিরা তাঁর ওপর ক্ষুব্ধ হন।
বিভাগের কর্মচারী ফজলুর রহমান দীর্ঘদিন ধরে আসমাকে হেনস্তা ও অসহযোগিতা করে আসছিলেন। একপর্যায়ে বিভাগীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের দায়ে ফজলুরকে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে বদলি করা হয় এবং তাঁর বেতন বন্ধ করে দেওয়া হয়। এই বদলির সিদ্ধান্তে শিক্ষক হাবিবুর রহমান আসমাকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেন। অন্যদিকে, আর্থিক অনিয়মের দায়ে বিশ্বজিৎ কুমারকেও বদলি করা হয় গত ১৮ ফেব্রুয়ারি। এই বদলি ও প্রশাসনিক সংস্কারের জেরেই আসামিরা একত্রিত হয়ে আসমাকে হত্যার পরিকল্পনা করেন বলে মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে।
কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা (আরএমও) হোসেন ইমামের নেতৃত্বে পরিচালিত ময়নাতদন্তে হত্যাকাণ্ডের ভয়াবহ চিত্র ফুটে উঠেছে। আসমার শরীরে ২০টিরও বেশি গভীর ক্ষত পাওয়া গেছে।
মূল আঘাত: গলার নিচে সজোরে ছুরিকাঘাতের ফলে গভীর ক্ষত সৃষ্টি হয়, যা মৃত্যুর প্রধান কারণ বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ধস্তাধস্তি: বুক, পেট ও হাত-পায়ে অসংখ্য আঘাতের চিহ্ন থেকে স্পষ্ট হয় যে, আসমা নিজেকে বাঁচানোর জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছিলেন। এমনকি তাঁর হাত কেটে যাওয়ার চিহ্নও পাওয়া গেছে।
ঘটনার সময় অফিসকক্ষ থেকে রক্তাক্ত অবস্থায় উদ্ধার হওয়া কর্মচারী ফজলুর রহমান বর্তমানে কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালের আইসিইউতে চিকিৎসাধীন। তিনি পুলিশের কাছে দুই পাতার লিখিত বক্তব্য প্রদান করেছেন। সেখানে তিনি স্বীকার করেছেন যে, বদলি হওয়া এবং বেতন বন্ধ হয়ে যাওয়ার ক্ষোভ থেকে তিনি এই হত্যার পরিকল্পনা করেন। তবে মামলার বাদী দাবি করেছেন, ফজলুর কেবল হাতের পুতুল ছিলেন; মূল পরিকল্পনা ছিল ওপর মহলের।
বৃহস্পতিবার আসমা সাদিয়ার লাশ কুষ্টিয়া পৌর কবরস্থানে দাফন করা হয়েছে। জানাজায় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। অন্যদিকে, এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে বৃহস্পতিবার সকাল থেকেই শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাস উত্তাল করে তোলেন। তাঁরা ৯ দফা দাবি পেশ করেছেন, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো:
১. দ্রুততম সময়ে হত্যাকারীর ফাঁসি নিশ্চিত করা।
২. ক্যাম্পাসের সর্বত্র সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন ও নিরাপত্তা জোরদার করা।
৩. বহিরাগতদের প্রবেশ নিষিদ্ধ করা এবং স্মার্ট আইডি কার্ডের ব্যবহার নিশ্চিত করা।
৪. কর্মচারীদের জবাবদিহি ও নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা আনয়ন।
পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, নামীয় চার আসামির বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করা হচ্ছে এবং ঘটনার সাথে আরও কেউ জড়িত আছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।