খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: সোমবার, ৯ মার্চ ২০২৬
মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার পারদ আরও কয়েক ধাপ বাড়িয়ে দিয়ে ইরানের রাজধানী তেহরানে বড় ধরনের বিমান হামলা চালিয়েছে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী। ইসরায়েলের দাবি অনুযায়ী, এই অভিযানে তারা ইরানের মহাকাশ গবেষণার আড়ালে পরিচালিত সামরিক স্থাপনা এবং কয়েক ডজন সুসংরক্ষিত অস্ত্রাগার ধ্বংস করে দিয়েছে। ইরানের ইসলামি রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) কৌশলগত শক্তির ওপর আঘাত হানার লক্ষ্যেই এই সুপরিকল্পিত হামলা পরিচালনা করা হয়েছে বলে তেল আবিব নিশ্চিত করেছে।
ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনীর (আইডিএফ) পক্ষ থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম টেলিগ্রামে প্রকাশিত এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে জানানো হয়েছে, তাদের যুদ্ধবিমানগুলো তেহরানের উপকণ্ঠে অবস্থিত ইরানের মহাকাশ সংস্থার গবেষণা কেন্দ্রকে লক্ষ্য করে নির্ভুল হামলা চালিয়েছে। ইসরায়েলের দাবি, এই গবেষণা কেন্দ্রটি মূলত আইআরজিসির ‘স্পেস ফোর্স’ বা মহাকাশ বাহিনীর সদর দপ্তর হিসেবে ব্যবহৃত হতো, যা ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তির উন্নয়নে প্রধান ভূমিকা পালন করে।
বিবৃতিতে আরও উল্লেখ করা হয়েছে যে, আইআরজিসির স্পেস ফোর্স সদর দপ্তরটি এই হামলায় সম্পূর্ণ ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছে। এর পাশাপাশি ইসরায়েলি গোয়েন্দাদের চিহ্নিত করা আরও অর্ধশতাধিক লক্ষ্যবস্তুতে একযোগে আঘাত হানা হয়।
ইসরায়েলি দাবিকৃত হামলার লক্ষ্যবস্তুর সংক্ষিপ্ত তালিকা
| লক্ষ্যবস্তুর ধরণ | সংখ্যা/বিবরণ | কৌশলগত গুরুত্ব |
| আইআরজিসি স্পেস ফোর্স সদর দপ্তর | ১টি (সম্পূর্ণ ধ্বংসের দাবি) | ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও স্যাটেলাইট নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র |
| গোলাবারুদ সংরক্ষণাগার (বাঙ্কার) | ৫০টি ভূগর্ভস্থ বাঙ্কার | আকাশ প্রতিরক্ষা ও দূরপাল্লার মিসাইল মজুত |
| বাসিজ বাহিনী ঘাঁটি | ১টি কমান্ড সেন্টার | অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও আধাসামরিক বাহিনী নিয়ন্ত্রণ |
| আইআরজিসি সামরিক কম্পাউন্ড | ১টি সমন্বিত কমপ্লেক্স | সামরিক প্রশিক্ষণ ও লজিস্টিক সাপোর্ট সেন্টার |
ইসরায়েলের এই দাবি যদি সত্য হয়, তবে এটি সাম্প্রতিক সময়ের মধ্যে ইরানের অভ্যন্তরে চালানো অন্যতম বড় আকারের সামরিক অভিযান। মহাকাশ সংস্থার ওপর এই আঘাত ইরানের দীর্ঘ পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতাকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলতে পারে। ইসরায়েলি সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের এই স্পেস ফোর্স মূলত বেসামরিক গবেষণার ছদ্মবেশে মহাকাশে গোয়েন্দা স্যাটেলাইট পাঠানো এবং আন্তঃমহাদেশীয় ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির কাজ করত।
হামলা প্রসঙ্গে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর মুখপাত্র জানিয়েছেন, ইরানের পক্ষ থেকে যেকোনো ধরনের উসকানিমূলক কর্মকাণ্ডের জবাবে এই অভিযান ছিল একটি সুস্পষ্ট সতর্কবার্তা। তবে ইরানের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি। তেহরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমগুলো বিস্ফোরণের শব্দ শোনার কথা নিশ্চিত করলেও ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ কমিয়ে দেখানোর চেষ্টা করছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এই হামলার পর মধ্যপ্রাচ্যে এক ভয়াবহ যুদ্ধ পরিস্থিতির আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকরা। ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস এই হামলার কঠোর প্রতিশোধ নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে তেহরান ও পার্শ্ববর্তী এলাকায় আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা আরও জোরদার করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় বিশেষ করে জাতিসংঘ এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন পক্ষগুলোকে সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র এই পরিস্থিতিতে ইসরায়েলের আত্মরক্ষার অধিকারের প্রতি সমর্থন জানালেও পূর্ণাঙ্গ আঞ্চলিক যুদ্ধ এড়াতে কূটনৈতিক তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে।
বর্তমানে তেহরানের আকাশে থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। ইরানের মহাকাশ কর্মসূচির ওপর এই আঘাত দেশটির সামরিক সক্ষমতাকে কতটা পিছিয়ে দেয় এবং ইরান এর জবাবে কী ধরনের পদক্ষেপ নেয়, তার ওপরই নির্ভর করছে আগামীর বিশ্ব পরিস্থিতি।