মধ্যপ্রাচ্যে ইরান, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রকে ঘিরে চলমান উত্তেজনার জেরে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক বাণিজ্যপথ হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ব্যাপকভাবে ব্যাহত হয়েছে। আইনগতভাবে প্রণালিটি বন্ধ ঘোষণা না করা হলেও নিরাপত্তা ঝুঁকি, সামরিক উপস্থিতি এবং আন্তর্জাতিক বিমা কাভারেজের ঘাটতির কারণে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল প্রায় ৯০ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে বলে আন্তর্জাতিক শিপিং বিশ্লেষকদের ধারণা। ফলে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ শৃঙ্খলেও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
এমন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের জ্বালানি সরবরাহ যাতে ব্যাহত না হয়, সে লক্ষ্যেই কূটনৈতিক উদ্যোগ জোরদার করেছে সরকার। সরকারের অনুরোধে ইরান আশ্বাস দিয়েছে যে বাংলাদেশের তেলবাহী জাহাজগুলোর চলাচলে তারা কোনো বাধা দেবে না। সোমবার (১০ মার্চ) সচিবালয়ে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদের সঙ্গে ঢাকায় নিযুক্ত ইরানের রাষ্ট্রদূত জলিল রহীমি জাহানাবাদীর এক বৈঠকে এ আশ্বাস দেওয়া হয় বলে মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন।
বৈঠকের আলোচনায় উঠে আসে যে বর্তমানে ইরান হরমুজ প্রণালিতে ইসরায়েল বা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট জাহাজের ওপর কঠোর নজরদারি ও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ তার তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) পরিবহনকারী জাহাজগুলোর নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করতে ইরানের সহযোগিতা চায়। ইরান এতে সম্মতি জানালেও একটি শর্ত দিয়েছে—বাংলাদেশি জ্বালানিবাহী জাহাজগুলোকে প্রণালিতে প্রবেশের আগে তাদের পরিচয় ও অবস্থান সম্পর্কে ইরান কর্তৃপক্ষকে অবহিত করতে হবে, যাতে ভুল বোঝাবুঝির কারণে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটে।
আন্তর্জাতিক শিপিং পর্যবেক্ষণ সংস্থাগুলোর তথ্যমতে, হরমুজ প্রণালিতে বর্তমানে প্রায় এক হাজার জাহাজ বিভিন্ন কারণে আটকা পড়ে আছে। অনেক জাহাজ তাদের অটোমেটিক আইডেন্টিফিকেশন সিস্টেম (এআইএস) বন্ধ করে গোপনে চলাচলের চেষ্টা করলেও এতে ঝুঁকি আরও বেড়েছে। বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় বহু শিপিং কোম্পানি আপাতত এই রুটে কার্যক্রম স্থগিত রেখেছে।
হরমুজ প্রণালির গুরুত্ব
| বিষয় |
তথ্য |
| অবস্থান |
পারস্য উপসাগর ও ওমান উপসাগরের সংযোগস্থল |
| বৈশ্বিক তেল পরিবহনের অংশ |
প্রায় ২০–২৫ শতাংশ |
| দৈনিক তেল পরিবহন |
আনুমানিক ১৮–২০ মিলিয়ন ব্যারেল |
| বর্তমান চলাচল হ্রাস |
প্রায় ৯০ শতাংশ |
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই প্রণালিটি মধ্যপ্রাচ্যের তেল রপ্তানির প্রধান করিডোর হওয়ায় এখানে যেকোনো অস্থিরতা বিশ্ববাজারে দ্রুত প্রভাব ফেলে।
এদিকে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতির কারণে বিকল্প জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করার দিকেও নজর দিচ্ছে বাংলাদেশ। জ্বালানি বিভাগ জানিয়েছে, দেশে বর্তমানে পর্যাপ্ত মজুদ রয়েছে। সম্প্রতি সিঙ্গাপুর থেকে ২৭ হাজার টন ডিজেলবাহী একটি জাহাজ চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছেছে। এছাড়া চলতি সপ্তাহে আরও চারটি জাহাজে প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার ২০৫ টন জ্বালানি দেশে আসার কথা রয়েছে।
সাম্প্রতিক জ্বালানি আমদানির চিত্র
| উৎস |
জ্বালানির ধরন |
পরিমাণ |
| সিঙ্গাপুর |
ডিজেল |
২৭,০০০ টন |
| বিভিন্ন উৎস (চলতি সপ্তাহ) |
তেল ও জ্বালানি |
১,২০,২০৫ টন |
| আসাম, ভারত |
পাইপলাইনে ডিজেল |
৫,০০০ টন |
ভারতের আসাম রাজ্যের নুমালিগড় রিফাইনারি থেকে পাইপলাইনের মাধ্যমে পাঁচ হাজার টন ডিজেল বাংলাদেশে আসার কথা রয়েছে। পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে ভারতের ওপর বাংলাদেশের জ্বালানি নির্ভরতা আরও বাড়তে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
আন্তর্জাতিক বাজার বিশ্লেষকরা সতর্ক করে বলেছেন, মধ্যপ্রাচ্যের এই সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে শুধু জ্বালানি নয়, বৈশ্বিক খাদ্য সরবরাহ শৃঙ্খলেও চাপ তৈরি হতে পারে। কারণ জ্বালানি পরিবহন ব্যাহত হলে কৃষি উৎপাদন, সার সরবরাহ এবং পণ্য পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি পায়।
এ প্রেক্ষাপটে সরকার জ্বালানি তেল, গ্যাস ও এলএনজির সরবরাহ পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে এবং বাজার তদারকি জোরদার করেছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, কূটনৈতিক উদ্যোগ, বিকল্প সরবরাহ উৎস এবং পর্যাপ্ত মজুদের মাধ্যমে সম্ভাব্য সংকট মোকাবিলায় প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।