খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: বুধবার, ১১ মার্চ ২০২৬
মধ্যপ্রাচ্যের রণক্ষেত্রে ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের চলমান সামরিক অভিযান নিয়ে খোদ ওয়াশিংটনের নীতি-নির্ধারণী মহলে অস্থিরতা শুরু হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ কয়েকজন শীর্ষ উপদেষ্টা তাকে এই যুদ্ধ থেকে দ্রুত নিষ্ক্রান্ত হওয়ার বা একটি ‘এক্সিট স্ট্র্যাটেজি’ খোঁজার পরামর্শ দিচ্ছেন। বৈশ্বিক বাজারে জ্বালানি তেলের আকাশচুম্বী দাম এবং দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের ফলে অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কায় তারা এই তাগিদ দিচ্ছেন। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ‘দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল’-এর এক বিশেষ প্রতিবেদনে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে।
ট্রাম্পের উপদেষ্টাদের একটি অংশ মনে করছে, ইরানের সামরিক সক্ষমতাকে চ্যালেঞ্জ জানানোর যে প্রাথমিক উদ্দেশ্য ছিল, তা ইতোমধ্যে অনেকটা অর্জিত হয়েছে। বর্তমানে এই যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়া মানেই হলো আমেরিকান অর্থনীতির ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করা। বিশেষ করে বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ায় খোদ যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরেও মুদ্রাস্ফীতির ঝুঁকি বাড়ছে। আসন্ন নির্বাচন ও জনমত বিবেচনায় নিয়ে উপদেষ্টারা ট্রাম্পকে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন যে, একটি অন্তহীন যুদ্ধ তার রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের জন্য আত্মঘাতী হতে পারে।
নিচে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র বর্তমান সংকটের প্রধান কারণ ও সম্ভাব্য প্রভাবের একটি তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরা হলো:
| সংকটের ক্ষেত্র | বর্তমান পরিস্থিতি ও প্রভাব |
| জ্বালানি বাজার | তেলের দাম অস্বাভাবিক বৃদ্ধি পেয়েছে, যা বিশ্ব অর্থনীতিকে অস্থির করে তুলছে। |
| সামরিক লক্ষ্য | উপদেষ্টাদের মতে প্রাথমিক লক্ষ্য অর্জিত, তবে ট্রাম্প পূর্ণ বিজয়ের পক্ষে। |
| আঞ্চলিক নিরাপত্তা | ইসরায়েল ও ইরানের পাল্টাপাল্টি হামলায় মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ার শঙ্কা। |
| ট্রাম্পের অবস্থান | সোমবারের ভাষণে যুদ্ধ দ্রুত শেষ করার প্রতিশ্রুতি দিলেও অনড় মনোভব। |
| ইরানের প্রতিক্রিয়া | প্রচণ্ড সামরিক চাপের মুখেও দাবি মেনে নিতে তেহরানের ক্রমাগত অস্বীকৃতি। |
যদিও উপদেষ্টারা যুদ্ধ থেকে সরে আসার পরামর্শ দিচ্ছেন, তবে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ব্যক্তিগত অবস্থান এখনো বেশ কঠোর। সোমবার রাতে এক বক্তব্যে তিনি দাবি করেছেন যে, ইরানের বিরুদ্ধে এই অভিযান শিগগিরই সফলভাবে সম্পন্ন হবে। তবে ট্রাম্প প্রশাসনের এক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, বাস্তবতা অতটা সহজ নয়। তার মতে, তেহরান যতদিন মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকান ও ইসরায়েলি স্থাপনায় হামলা অব্যাহত রাখবে, ততদিন যুক্তরাষ্ট্র এই সংঘাত থেকে পিছু হটবে না।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ট্রাম্প কিছুটা বিস্মিত হয়েছেন যে, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের এত তীব্র সামরিক চাপের মুখেও ইরান পিছু হটছে না বা তাদের দাবিগুলো মেনে নিচ্ছে না। ট্রাম্প মনে করেছিলেন কয়েক দফা শক্তিশালী আঘাতেই ইরান আলোচনার টেবিলে আসবে, কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতি তাকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে।
ইসরায়েল এই যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান সহযোগী হিসেবে সরাসরি ইরানের বিভিন্ন কৌশলগত নিশানায় আঘাত হানছে। তেহরানও তাদের ক্ষেপণাস্ত্র শক্তি ব্যবহার করে পাল্টা জবাব দিচ্ছে। এই দ্বি-পাক্ষিক সংঘাত এখন একটি আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নেওয়ার উপক্রম হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র যদি এখনই যুদ্ধ থেকে সরে আসার সম্মানজনক পথ খুঁজে না পায়, তবে মধ্যপ্রাচ্যে তাদের দীর্ঘদিনের সামরিক ও কৌশলগত প্রভাব ক্ষুণ্ণ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
উপদেষ্টারা আশঙ্কা করছেন, ইরান যদি দীর্ঘমেয়াদী প্রতিরোধ গড়ে তোলে এবং রাশিয়ার মতো মিত্রদের কাছ থেকে পরোক্ষ সহায়তা পায়, তবে যুক্তরাষ্ট্র বড় ধরনের চোরাবালিতে আটকে যেতে পারে। তাই ‘বিজয়’ সংজ্ঞায়িত করা এবং একটি সুনির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে অপারেশন শেষ করার জন্য ট্রাম্পের ওপর চাপ বাড়ছে। এখন দেখার বিষয়, ডোনাল্ড ট্রাম্প তার উপদেষ্টাদের সাবধানবাণী শোনেন নাকি নিজস্ব ‘ম্যাক্সিমাম প্রেশার’ নীতিতে অটল থেকে যুদ্ধ চালিয়ে যান।