খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: সোমবার, ১৩ এপ্রিল ২০২৬
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনা প্রশমনের লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে অনুষ্ঠিত উচ্চপর্যায়ের কূটনৈতিক বৈঠক শেষ হয়েছে কোনো চূড়ান্ত ফলাফল ছাড়াই। পাকিস্তানের রাজধানী Islamabad-এ টানা প্রায় ১৪ ঘণ্টা ধরে চলা এই আলোচনা শেষে উভয় পক্ষই নিজ নিজ দেশে ফিরে গেছে। তবে দীর্ঘ আলোচনার পরও কোনো আনুষ্ঠানিক চুক্তি বা যৌথ ঘোষণা না আসায় বৈঠকের ফলাফল নিয়ে অনিশ্চয়তা থেকেই গেছে।
এই গুরুত্বপূর্ণ আলোচনায় মধ্যস্থতাকারী হিসেবে ভূমিকা পালন করে Pakistan। দেশটি জানিয়েছে, দুই পক্ষকে সংলাপে যুক্ত রাখাই তাদের মূল লক্ষ্য এবং তারা ভবিষ্যতেও এই উদ্যোগ অব্যাহত রাখবে। তবে কবে আবার নতুন করে আলোচনা শুরু হতে পারে, সে বিষয়ে এখনো কোনো স্পষ্ট ইঙ্গিত পাওয়া যায়নি।
বৈঠক শেষে উভয় পক্ষের বক্তব্যে মতবিরোধ ও আস্থার ঘাটতির বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
ইরানের পক্ষের প্রধান আলোচক ও পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ অভিযোগ করেন, যুক্তরাষ্ট্র এমন কোনো আস্থা-নির্মাণমূলক পদক্ষেপ নিতে পারেনি, যা ভবিষ্যৎ অগ্রগতির ভিত্তি তৈরি করতে পারে। তাঁর ভাষায়, “আমাদের দিক থেকে সদিচ্ছা থাকলেও যুক্তরাষ্ট্র আস্থা অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে।”
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি ও ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স বলেন, “কোনো চুক্তি ছাড়াই আলোচনা শেষ হয়েছে। ইরান চূড়ান্ত ও সর্বোত্তম প্রস্তাব গ্রহণে ব্যর্থ হয়েছে।”
তবে উভয় পক্ষই আলোচনার দরজা সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করেনি। ইরান জানিয়েছে, তারা সংলাপ চালিয়ে যেতে আগ্রহী এবং কারিগরি পর্যায়ে প্রস্তাব বিনিময় অব্যাহত থাকবে।
বৈঠকে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল। বিশেষ করে পারমাণবিক কর্মসূচি, আঞ্চলিক নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা ও কৌশলগত জলপথ নিয়ে মতবিরোধ স্পষ্টভাবে উঠে আসে।
| বিষয় | ইরানের অবস্থান | যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান |
|---|---|---|
| পারমাণবিক কর্মসূচি | শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়ার অধিকার দাবি | পারমাণবিক অস্ত্র সক্ষমতা সম্পূর্ণ বন্ধের দাবি |
| হরমুজ প্রণালি | নিয়ন্ত্রণ ইরানের অধীনে থাকবে | আন্তর্জাতিক নিয়ন্ত্রণ ও নিরাপদ নৌচলাচল নিশ্চিত করা |
| নিষেধাজ্ঞা | সব নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের দাবি | শর্তসাপেক্ষে শিথিলতার প্রস্তাব |
| যুদ্ধ ক্ষতিপূরণ | ক্ষতিপূরণের দাবি | সরাসরি কোনো প্রতিশ্রুতি নেই |
| আঞ্চলিক সংঘাত | যুদ্ধবিরতির সম্প্রসারণ চায় | নিরাপত্তা শর্ত কঠোর করার পক্ষে |
আলোচনায় সবচেয়ে বড় অগ্রগতি না হওয়া বিষয় ছিল ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি। যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, ইরানকে সম্পূর্ণভাবে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সক্ষমতা থেকে সরে আসতে হবে। অন্যদিকে তেহরান দাবি করছে, পারমাণবিক শক্তির শান্তিপূর্ণ ব্যবহার তাদের সার্বভৌম অধিকার।
যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স সতর্ক করে বলেন, “ইরান যেন কোনোভাবেই এমন প্রযুক্তি অর্জন না করে, যা দ্রুত পারমাণবিক অস্ত্র তৈরিতে সক্ষম করে।”
বিশ্ব বাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ Strait of Hormuz নিয়ে আলোচনায় সবচেয়ে কঠোর অবস্থান নেয় দুই পক্ষ।
এই প্রণালি দিয়ে বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ জ্বালানি তেল পরিবাহিত হয়। ইরান এটিকে তাদের ‘চূড়ান্ত রেড লাইন’ হিসেবে ঘোষণা করেছে। দেশটির পার্লামেন্টের ডেপুটি স্পিকার জানিয়েছেন, প্রণালির নিয়ন্ত্রণ ইরানের হাতেই থাকবে এবং নৌযান চলাচলের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট শর্ত প্রযোজ্য হবে।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক নেতৃত্ব হুমকি দিয়েছে, প্রয়োজন হলে নৌপথে কড়াকড়ি আরোপ করা হবে।
আলোচনার সময়েই যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক ও বর্তমান রাজনৈতিক নেতৃত্ব থেকে কড়া বক্তব্য আসে। বৈঠক ব্যর্থ হওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে আরও কঠোর অবস্থানের ইঙ্গিত দেওয়া হয়।
বিশ্লেষকদের মতে, এই ধরনের বক্তব্য কূটনৈতিক অগ্রগতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।
আলোচনায় অগ্রগতি না হওয়ার একটি বড় প্রেক্ষাপট ছিল মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত। বিশেষ করে Lebanon-এ চলমান সংঘর্ষ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
সেখানে সাম্প্রতিক ইসরায়েলি হামলায় অন্তত ১৩ জন নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে বলে স্থানীয় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে। এই সহিংসতা আঞ্চলিক উত্তেজনাকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে।
সংঘাত ও হামলার মধ্যেও ইরান তাদের জ্বালানি অবকাঠামো পুনরুদ্ধারের পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে। দেশটির তেল মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ক্ষতিগ্রস্ত শোধনাগার ও সরবরাহ ব্যবস্থা এক থেকে দুই মাসের মধ্যে ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ সক্ষমতায় ফিরিয়ে আনার লক্ষ্য রয়েছে। ইতিমধ্যে মেরামত কাজ শুরু হয়েছে এবং কিছু ইউনিট শিগগিরই পুনরায় উৎপাদনে ফিরতে পারে।
সব মিলিয়ে Islamabad বৈঠককে কূটনৈতিকভাবে একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হিসেবে দেখা হলেও বাস্তব অগ্রগতি হয়নি। তবে উভয় পক্ষ আলোচনার পথ খোলা রাখায় আন্তর্জাতিক মহলে কিছুটা হলেও আশার আলো দেখা যাচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, পারমাণবিক ইস্যু, আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও জ্বালানি পথ নিয়ে মতবিরোধ সমাধান না হলে ভবিষ্যতে এই সংকট আরও গভীর হতে পারে।