খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: বুধবার, ৬ মে ২০২৬
রাঙামাটির লংগদু উপজেলায় ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি-এর একটি এজেন্ট ব্যাংকিং আউটলেটের মালিক মো. রাসেলের বিরুদ্ধে গ্রাহকদের বিপুল পরিমাণ অর্থ আত্মসাৎ করে আত্মগোপন করার অভিযোগ উঠেছে। গত সোমবার (৪ মে, ২০২৬) থেকে সংশ্লিষ্ট আউটলেটটি বন্ধ পাওয়া যাচ্ছে এবং অভিযুক্ত এজেন্ট মালিক পলাতক রয়েছেন বলে স্থানীয় সূত্রে নিশ্চিত করা হয়েছে। প্রাথমিক তথ্যানুযায়ী, জালিয়াতির মাধ্যমে হাতিয়ে নেওয়া এই অর্থের পরিমাণ প্রায় ৬ থেকে ৮ কোটি টাকা হতে পারে বলে ক্ষতিগ্রস্ত গ্রাহকরা দাবি করেছেন।
লংগদু উপজেলার স্থানীয় বাসিন্দা ও ভুক্তভোগী গ্রাহকদের ভাষ্যমতে, তারা দীর্ঘ সময় ধরে ওই আউটলেটে তাদের সঞ্চিত অর্থ জমা দিয়ে আসছিলেন। লেনদেনের সময় এজেন্ট মালিক মো. রাসেল গ্রাহকদের যথাযথ জমা রসিদ (মানি রিসিট) প্রদান করতেন, যার ফলে গ্রাহকদের মনে কোনো সন্দেহের উদ্রেক হয়নি। তবে বর্তমানে জানা যাচ্ছে যে, সেই রসিদগুলোর একটি বড় অংশ ছিল ভুয়া। রাসেল গ্রাহকদের কাছ থেকে টাকা গ্রহণ করলেও তা ব্যাংকের মূল সার্ভারে বা গ্রাহকের নির্দিষ্ট অ্যাকাউন্টে জমা না দিয়ে নিজের কাছে রেখে দিতেন।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট ও স্থানীয় সূত্রগুলো থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, রাসেল অনেক ক্ষেত্রে গ্রাহকদের সঙ্গে ব্যক্তিগত সুসম্পর্ক ও মৌখিক সমঝোতার সুযোগ নিতেন। অধিক মুনাফার প্রলোভন বা ব্যক্তিগত ব্যবসায় বিনিয়োগের কথা বলে অনেক গ্রাহকের টাকা তিনি ব্যাংকিং সিস্টেমের বাইরেও ব্যবহার করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। গত সোমবার সকালে গ্রাহকরা আউটলেটে এসে সেটি তালাবদ্ধ অবস্থায় দেখতে পান এবং রাসেলের ব্যক্তিগত মুঠোফোনটি বন্ধ পান। এর পরপরই এলাকায় ব্যাপক উত্তেজনা ও গ্রাহকদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
আউটলেটের সামনে ভিড় করা ক্ষুব্ধ গ্রাহকরা জানান, তাদের কাছে ব্যাংকের সিলযুক্ত জমা রসিদ থাকা সত্ত্বেও ব্যাংকিং স্টেটমেন্টে কোনো টাকার হদিস মিলছে না। ভুক্তভোগীদের অনেকেই তাদের সারা জীবনের সঞ্চয়, প্রবাস থেকে পাঠানো রেমিট্যান্স এবং পেনশনের টাকা এই আউটলেটে জমা রেখেছিলেন। একজন ভুক্তভোগী জানান, “আমরা ব্যাংকের ওপর বিশ্বাস করে টাকা জমা দিয়েছি এবং রসিদ বুঝে নিয়েছি। কিন্তু এখন শুনছি আমাদের অ্যাকাউন্টে কোনো ব্যালেন্স নেই।”
ঘটনার প্রেক্ষাপটে লংগদু বাজার ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি আবুল কাসেম মেম্বার জানান, রাসেলের পলায়নের বিষয়টি ব্যবসায়ী সমাজ ও সাধারণ মানুষের মধ্যে গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। তিনি ইতোমধ্যে ব্যাংক কর্তৃপক্ষের সঙ্গে প্রাথমিক আলোচনা করেছেন এবং গ্রাহকদের ধৈর্য ধরার আহ্বান জানিয়েছেন যাতে নিয়মতান্ত্রিকভাবে আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা সম্ভব হয়।
ইসলামী ব্যাংকের রাঙামাটি জেলা শাখা অফিসের কর্মকর্তা আশরাফুল এ বিষয়ে ব্যাংকের অবস্থান পরিষ্কার করেছেন। তিনি জানান:
“ব্যাংকিং নিয়মানুযায়ী যাদের লেনদেন বৈধ এবং যাদের অ্যাকাউন্টে টাকা জমা হওয়ার ডিজিটাল রেকর্ড রয়েছে, তাদের দুশ্চিন্তার কোনো কারণ নেই। তারা অবশ্যই তাদের টাকা ফেরত পাবেন। তবে ব্যাংকিং সিস্টেমের বাইরে যদি কোনো গ্রাহক এজেন্টের সঙ্গে ব্যক্তিগত লেনদেন বা নিয়মবহির্ভূত কোনো আর্থিক সমঝোতা করে থাকেন, তবে তার দায়ভার ব্যাংক কর্তৃপক্ষ গ্রহণ করবে না।”
লংগদু থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. জাকারিয়া গণমাধ্যমকে জানান যে, বিষয়টি সম্পর্কে পুলিশ অবগত রয়েছে এবং পরিস্থিতির ওপর নজর রাখা হচ্ছে। তবে প্রতিবেদনটি তৈরি করা পর্যন্ত কোনো ভুক্তভোগী গ্রাহক থানায় এসে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেননি। তিনি আরও উল্লেখ করেন, লিখিত অভিযোগ প্রাপ্তিমাত্রই অভিযুক্ত মো. রাসেলকে আইনের আওতায় আনতে এবং গ্রাহকদের অর্থ উদ্ধারে প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
বর্তমানে ওই এলাকায় পুলিশি টহল জোরদার করা হয়েছে এবং ব্যাংক কর্তৃপক্ষ অভ্যন্তরীণভাবে জালিয়াতির প্রকৃত মাত্রা নির্ধারণে তদন্ত শুরু করেছে। পলাতক এজেন্টের অবস্থান শনাক্ত করার চেষ্টা চলছে বলে স্থানীয় প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে। এজেন্টের এই কর্মকাণ্ডের ফলে স্থানীয় পর্যায়ে ব্যাংকিং সেবার ওপর জনমনে আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন, দ্রুত আইনি ব্যবস্থা এবং ব্যাংক কর্তৃপক্ষের কার্যকর পদক্ষেপের মাধ্যমে এই সংকটের সমাধান হবে।