খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: 13শে বৈশাখ ১৪৩৩ | ২৬ই এপ্রিল ২০২৬ | 1150 Dhu al-Hijjah 5
বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য জরুরি ভিত্তিতে জলবায়ু বীমা বা ক্লাইমেট ইন্স্যুরেন্সের আওতা বাড়ানোর তাগিদ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা মনে করেন, ক্রমবর্ধমান জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের ক্ষতি কাটিয়ে ওঠার সক্ষমতা এই দরিদ্র পরিবারগুলোর নেই। তাই তাদের আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রীয় ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার কোনো বিকল্প নেই।
শনিবার খুলনার একটি অভিজাত হোটেলে অনুষ্ঠিত ‘উপকূলীয় অঞ্চলে দরিদ্রবান্ধব, লিঙ্গ-সংবেদনশীল এবং মানবাধিকার-ভিত্তিক জলবায়ু ও দুর্যোগ ঝুঁকি অর্থায়ন ও বীমা (CDRFI)’ শীর্ষক বিভাগীয় গোলটেবিল বৈঠকে এসব মতামত উঠে আসে। সংস্থা ‘অসেড’ (AOSED) এবং ‘কেয়ার বাংলাদেশ’-এর যৌথ উদ্যোগে এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।
বৈঠকে বিশেষজ্ঞরা উল্লেখ করেন যে, জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য দায়ী উন্নত দেশগুলো দীর্ঘকাল ধরে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোকে আর্থিক সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিলেও তা বাস্তবায়নে তারা ব্যর্থ হয়েছে। ১৯৯৫ সাল থেকে উন্নত দেশগুলো আর্থিক ও কারিগরি সহায়তার পাশাপাশি কার্বন নিঃসরণ কমানোর প্রতিশ্রুতি দিয়ে আসছে। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেছে, এই দীর্ঘ সময়ে কার্বন নিঃসরণ কমার বদলে উল্টো ৩৪.৪ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
অসেড-এর নির্বাহী পরিচালক শামীম আরফীন জানান, উন্নত দেশগুলো ক্ষতিপূরণ দেওয়ার বদলে বিভিন্ন কৌশলে বাংলাদেশকে ঋণের জালে আবদ্ধ করছে। তিনি আসন্ন জার্মানির বন জলবায়ু সম্মেলন এবং তুরস্কে অনুষ্ঠেয় কপা-৩১ (COP31) সম্মেলনে উন্নত দেশগুলোর সাথে কার্যকর দরকষাকষির মাধ্যমে ন্যায্য তহবিল আদায়ের জন্য সরকারকে জোরালো প্রস্তুতি নেওয়ার আহ্বান জানান।
উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর জন্য জলবায়ু বীমাকে একটি কার্যকর সমাধান হিসেবে চিহ্নিত করা হলেও এর বাস্তবায়নে বেশ কিছু বাধা রয়েছে। সাধারণ বীমা কর্পোরেশন এবং অন্যান্য বেসরকারি বীমা প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রান্তিক মানুষের উপযোগী ও সহজলভ্য বীমা পদ্ধতি চালু করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
জলবায়ু ঝুঁকি অর্থায়ন ও বীমা প্রকল্পের (MAP CDRFI) সংক্ষিপ্ত রূপরেখা:
| বৈশিষ্ট্য | বিবরণ |
| প্রকল্পের নাম | মাল্টি-অ্যাক্টর পার্টনারশিপ অন ক্লাইমেট অ্যান্ড ডিজাস্টার রিস্ক ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইন্স্যুরেন্স (MAP CDRFI) |
| বাস্তবায়নকারী সংস্থা | অসেড (AOSED) |
| সহযোগী ও কারিগরি সহায়ক | কেয়ার বাংলাদেশ (CARE Bangladesh) |
| অর্থায়নে | বিএমজেড (BMZ) |
| কার্যকাল | এপ্রিল ২০২৩ থেকে মার্চ ২০২৬ |
| বাস্তবায়ন এলাকা | বাগেরহাট ও সাতক্ষীরা জেলা |
বিশেষজ্ঞদের মতে, যেহেতু প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর পক্ষে বীমার প্রিমিয়াম পরিশোধ করা অসম্ভব, তাই সরকারকে এই প্রিমিয়ামের ব্যয়ভার বহন করতে হবে। এই অর্থের উৎস হিসেবে আন্তর্জাতিক জলবায়ু তহবিলকে ব্যবহারের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।
খুলনা সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক নজরুল ইসলাম মঞ্জু জানান, রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে জলবায়ু ইস্যুতে আলোচনার জন্য সুনির্দিষ্ট প্ল্যাটফর্মের অভাব রয়েছে। তিনি বর্তমান গণতান্ত্রিক সরকারের পক্ষ থেকে এই সংকটগুলো নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে তুলে ধরার আশ্বাস দেন।
অন্যদিকে, সুন্দরবন একাডেমির প্রধান নির্বাহী অধ্যাপক আনোয়ারুল কাদির অভিযোগ করেন যে, বীমা নীতিগুলো জনবান্ধব না হয়ে মুনাফাভিত্তিক হওয়ার কারণেই এখন পর্যন্ত কোনো টেকসই সমাধান আসেনি। খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক শরীফ হাসান লিমন বলেন, আন্তর্জাতিক জলবায়ু তহবিল পেতে হলে জাতীয় ও স্থানীয় পর্যায়ে শক্তিশালী ডাটাবেজ বা তথ্যভাণ্ডার থাকা আবশ্যক। অধ্যাপক ড. নাজিয়া হাসান জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় একটি দীর্ঘমেয়াদী ও গবেষণা-ভিত্তিক মাস্টার প্ল্যান প্রণয়নের ওপর জোর দেন।
সাতক্ষীরার এনজিও প্রতিনিধি আশিক ই ইলাহী বীমা খাতের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তিনি জানান, দুর্নীতি ও আস্থার সংকটের কারণে সাধারণ মানুষ বীমার প্রতি আগ্রহী হচ্ছে না। কেয়ার বাংলাদেশের টেকনিক্যাল কোঅর্ডিনেটর হিমাদ্রি শেখর মন্ডল সতর্ক করে বলেন, বর্তমানে জলবায়ু অর্থায়নের মডেলগুলো দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে, যেখানে অনুদান ও ঋণের মধ্যে পার্থক্য করা কঠিন হয়ে পড়ছে।
উপকূলীয় কৃষি প্রসঙ্গে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক কৃষিবিদ মো. নজরুল ইসলাম জানান, তরমুজ ও সূর্যমুখী চাষের মাধ্যমে ফসলের বহুমুখীকরণের চেষ্টা চলছে। তবে বৈরি জলবায়ুতে এটি টিকিয়ে রাখতে আরও আর্থিক ও প্রযুক্তিগত সহায়তা প্রয়োজন।
অনুষ্ঠানে অন্যান্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন কুয়েট অধ্যাপক ড. তুষার কান্তি রায়, মৎস্য অধিদপ্তরের পরিচালক বিপ্লব কুমার বসাক, এবং বিভিন্ন গণমাধ্যম ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিবৃন্দ। সকলের ঐক্যমত ছিল যে, উপকূলীয় মানুষের জীবনমান রক্ষায় একটি স্বচ্ছ, জনমুখী এবং রাষ্ট্রীয়ভাবে পৃষ্ঠপোষকতা প্রাপ্ত জলবায়ু বীমা ব্যবস্থা প্রবর্তন করা এখন সময়ের দাবি।