খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: শুক্রবার, ৬ মার্চ ২০২৬
অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক উপদেষ্টাদের বিরুদ্ধে একের পর এক দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ প্রকাশ্যে আসতে শুরু করেছে। ক্ষমতা ছাড়ার অল্প সময়ের মধ্যেই এসব অভিযোগ জমা পড়ছে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক)। অভিযোগের পরিমাণ ও গুরুত্ব বিবেচনায় নিয়ে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো ইতোমধ্যে কিছু অভিযোগের প্রাথমিক অনুসন্ধানও শুরু করেছে। ফলে অন্তর্বর্তী সরকারের কর্মকাণ্ড ও স্বচ্ছতা নিয়ে নতুন করে জনমনে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, জুলাই অভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে দেশের ছাত্রসমাজ ও সাধারণ মানুষ যাদের ওপর আস্থা রেখে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব দিয়েছিল, তাদের কয়েকজনের বিরুদ্ধে এখন ক্ষমতার অপব্যবহার, অনিয়ম ও আর্থিক দুর্নীতির অভিযোগ উঠছে। অভিযোগের মধ্যে রয়েছে প্রভাব খাটিয়ে নিয়োগ প্রদান, প্রকল্প ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি, তহবিল তছরুফ এবং অবৈধ সম্পদ অর্জনের মতো বিষয়।
বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) ইতোমধ্যে কয়েকজন সাবেক উপদেষ্টা ও একজন বিশেষ সহকারীর ব্যাংক হিসাবের তথ্য তলব করেছে। মানি লন্ডারিং ও অর্থ পাচারের সম্ভাব্য অভিযোগ যাচাই করতে দেশের সব ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কাছে তাদের লেনদেন সংক্রান্ত তথ্য চাওয়া হয়েছে। তদন্তের আওতায় আসা ব্যক্তিদের মধ্যে রয়েছেন সাবেক উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান, ফাওজুল কবির খান, আসিফ মাহমুদ, আদিলুর রহমান খান এবং প্রধান উপদেষ্টার সাবেক বিশেষ সহকারী খোদা বখস চৌধুরী।
দুদক সূত্রে জানা গেছে, সাবেক প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূসসহ বেশ কয়েকজন উপদেষ্টার বিরুদ্ধেই লিখিত অভিযোগ জমা পড়েছে। দায়িত্ব ছাড়ার মাত্র এক সপ্তাহের মধ্যেই এসব অভিযোগ জমা পড়া শুরু হয়।
বিশেষ করে সাবেক স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও যুব-ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে সবচেয়ে বেশি অভিযোগ উঠেছে। তার একান্ত সহকারী (এপিএস) মোয়াজ্জেম হোসেনের বিরুদ্ধে ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগ ওঠায় দায়িত্বে থাকা অবস্থাতেই তাকে বরখাস্ত করা হয়। এপিএসের বিরুদ্ধে অভিযোগগুলোও বর্তমানে তদন্তাধীন।
এছাড়া জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) আয়কর নথি বিশ্লেষণে দেখা গেছে, মোয়াজ্জেম হোসেনের গাড়িচালকের ভাই ২০২৪–২৫ অর্থবছরে তার আয়কর রিটার্নে প্রায় ১ কোটি ৮০ লাখ টাকার আয় দেখিয়েছেন, যা তার পেশাগত আয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলে মনে করছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। বিষয়টি নিয়েও অনুসন্ধান চলছে।
অভিযোগ রয়েছে, সাবেক উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের ব্যয় অযৌক্তিকভাবে বাড়ানোর পাশাপাশি নিজের এলাকায় নতুন প্রকল্প অনুমোদনে প্রভাব খাটিয়েছেন। উপজেলা পর্যায়ে মিনি স্টেডিয়াম নির্মাণ প্রকল্পের ব্যয় বৃদ্ধির বিষয়টিও তদন্তাধীন।
এদিকে তার সুপারিশে ঢাকা সিটি করপোরেশনের প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ পাওয়া এজাজের বিরুদ্ধেও তহবিল তছরুফ ও প্রশাসনিক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। এ বিষয়ে তদন্ত শুরু করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
অন্যদিকে আরেক সাবেক ছাত্র উপদেষ্টা নাহিদ ইসলামের একান্ত সচিব আতিক মোর্শেদের বিরুদ্ধে মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস ‘নগদ’-এ নিয়োগ সংক্রান্ত অনিয়মের মাধ্যমে শত কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে। একই সঙ্গে নাহিদ ইসলামের উত্তরসূরি হিসেবে দায়িত্ব পাওয়া মাহফুজ আলমের বিরুদ্ধে টেলিভিশন চ্যানেলের লাইসেন্স প্রদানে ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ দুদকে জমা পড়েছে।
এছাড়া সাবেক বাংলাদেশ ব্যাংক গভর্নর আহসান এইচ মনসুর এবং সাবেক স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নূরজাহান বেগমের বিরুদ্ধেও বিভিন্ন ধরনের অনিয়ম ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ এসেছে বলে জানা গেছে।
নিচে অভিযোগে আলোচিত কয়েকজন ব্যক্তির নাম ও অভিযোগের ধরন সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো—
| নাম | দায়িত্ব | অভিযোগের ধরন |
|---|---|---|
| আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া | সাবেক উপদেষ্টা | প্রকল্প ব্যয় বৃদ্ধি, প্রভাব খাটিয়ে নিয়োগ |
| মোয়াজ্জেম হোসেন | এপিএস | দুর্নীতি ও আর্থিক অনিয়ম |
| এজাজ | সিটি করপোরেশন প্রশাসক | তহবিল তছরুফ ও প্রশাসনিক অনিয়ম |
| আতিক মোর্শেদ | সাবেক সচিব | নিয়োগ দুর্নীতি ও অর্থ আত্মসাৎ অভিযোগ |
| মাহফুজ আলম | উপদেষ্টা | টিভি লাইসেন্সে ঘুষ গ্রহণের অভিযোগ |
এ বিষয়ে সুশাসন ও দুর্নীতিবিরোধী সংগঠনগুলোর মত হলো— অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হলে কঠোর জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, প্রাথমিকভাবে দুর্নীতির তথ্য পাওয়া গেলে তা গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা উচিত। আইনের দৃষ্টিতে কেউই ঊর্ধ্বে নয়— এ নীতির ভিত্তিতেই জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।