খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: শুক্রবার, ১৯ জুন ২০২৬
বিশ্বের বৃহত্তম বিমা কোম্পানিগুলোর মধ্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তির ব্যবহার এবং এই খাতের প্রযুক্তিগত প্রতিভা বা দক্ষ জনবল নিয়োগের প্রতিযোগিতায় বৈশ্বিক তালিকায় শীর্ষস্থান অর্জন করেছে অ্যালিয়ানজ। বেঞ্চমার্কিং প্ল্যাটফর্ম ‘এভিডেন্ট’ কর্তৃক প্রকাশিত ‘এভিডেন্ট এআই ইনডেক্স ফর ইন্স্যুরেন্স ২০২৬’ শীর্ষক বার্ষিক প্রতিবেদনে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ৩০টি বিমা প্রতিষ্ঠানকে পেছনে ফেলে এই গৌরব অর্জন করেছে কোম্পানিটি। বর্তমান বিমা শিল্পে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও আধুনিক প্রযুক্তির দ্রুত অভিযোজন এবং এই খাতে দক্ষ পেশাদারদের ক্রমবর্ধমান চাহিদার বিষয়টি এই সূচকের মাধ্যমে বিশদভাবে ফুটে উঠেছে।
বেঞ্চমার্কিং প্ল্যাটফর্ম এভিডেন্ট প্রতি বছর বিশ্বজুড়ে বিমা খাতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার, অগ্রগতি এবং প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা মূল্যায়ন করে এই সূচক বা ইনডেক্স প্রকাশ করে থাকে। আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত এই বার্ষিক সূচকে প্রধানত চারটি সুনির্দিষ্ট এবং গুরুত্বপূর্ণ ক্যাটাগরি বা বিভাগের ওপর ভিত্তি করে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় বিমা কোম্পানিগুলোর সামগ্রিক পারফরম্যান্স বা কার্যকারিতা মূল্যায়ন করা হয়। এই মূল্যায়নের নির্ধারিত সূচক বা ক্যাটাগরিগুলো হলো:
দক্ষ জনবল বা ট্যালেন্ট (Talent): এআই প্রযুক্তিতে দক্ষ কতজন বিশেষজ্ঞ এবং কর্মী প্রতিষ্ঠানে নিয়োজিত আছেন।
উদ্ভাবন বা ইনোভেশন (Innovation): নতুন নতুন এআই প্রযুক্তি তৈরি ও গবেষণায় প্রতিষ্ঠানের সাফল্য।
নেতৃত্ব বা লিডারশিপ (Leadership): প্রাতিষ্ঠানিক নীতি নির্ধারণ ও পরিচালনায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দূরদর্শী ব্যবহার।
স্বচ্ছতা বা ট্রান্সপারেন্সি (Transparency): এআই ব্যবহারের ক্ষেত্রে নৈতিকতা, জবাবদিহিতা ও তথ্যের স্বচ্ছতা নিশ্চিতকরণ।
এই চার ক্যাটাগরিতে সামগ্রিক উৎকর্ষতার পরিচয় দিয়ে ২০২৬ সালের তালিকায় শীর্ষস্থান দখল করেছে অ্যালিয়ানজ।
এভিডেন্ট-এর প্রকাশিত প্রতিবেদন ও পরিসংখ্যান অনুযায়ী, অ্যালিয়ানজ-এর এই তালিকায় এক নম্বর স্থান অর্জনের পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করেছে তাদের বিশাল ও দক্ষ কর্মী বাহিনী। কোম্পানিটির বর্তমান এআই ট্যালেন্ট পুল বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা খাতে নিয়োজিত দক্ষ বিশেষজ্ঞ দলের আকার তাদের নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বা দ্বিতীয় স্থানে থাকা বিমা কোম্পানির তুলনায় প্রায় ২৮ শতাংশ বড়।
বিশাল এবং সুনিপুণ এই বিশেষজ্ঞ কর্মীবাহিনীর কার্যকর সহায়তায় অ্যালিয়ানজ তাদের বিশ্বব্যাপী সামগ্রিক ব্যবসায়িক ও প্রাতিষ্ঠানিক কার্যক্রমে এ পর্যন্ত ৯০০টিরও বেশি সক্রিয় ‘এআই ইউজ কেস’ বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সফল প্রয়োগ ও ব্যবহারিক বাস্তবায়ন ঘটাতে সক্ষম হয়েছে। এত বিপুলসংখ্যক এআই ক্ষেত্র তৈরি করা এবং তা সফলভাবে পরিচালনা করার কারণেই বৈশ্বিক তালিকায় কোম্পানিটি শীর্ষস্থানে অবস্থান করছে।
বর্তমানে বৈশ্বিক বিমা শিল্পে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাধারণ ব্যবহারের গণ্ডি পেরিয়ে অত্যন্ত উন্নত এবং আধুনিক প্রযুক্তির একীকরণ ঘটছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো স্বায়ত্তশাসিত বা স্বয়ংক্রিয় ‘এজেন্টিক এআই’ (Agentic AI) সিস্টেম বা ব্যবস্থা। এই বিশেষ ব্যবস্থায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মানুষের প্রত্যক্ষ হস্তক্ষেপ ছাড়াই অত্যন্ত জটিল এবং বহুধাপ বিশিষ্ট ব্যবসায়িক বা দাপ্তরিক কাজ সুচারুভাবে একাই সম্পন্ন করতে পারে। আধুনিক বিমা কোম্পানিগুলো এখন তাদের মূল এবং প্রধান পরিচালনগত ক্ষেত্রগুলোতে এই উন্নত এআই প্রযুক্তি সফলভাবে যুক্ত করছে। এআই-এর এই আধুনিক ব্যবহার মূলত নিচের ক্ষেত্রগুলোতে সবচেয়ে বেশি দৃশ্যমান:
আন্ডাররাইটিং বা ঝুঁকি মূল্যায়ন: গ্রাহকের পলিসি অনুমোদনের পূর্বে আর্থিক ঝুঁকি অত্যন্ত নিখুঁতভাবে বিশ্লেষণ করা।
প্রতারণা বা জালিয়াতি শনাক্তকরণ: বিমা পলিসি এবং লেনদেনে যেকোনো ধরনের সন্দেহজনক কর্মকাণ্ড বা জালিয়াতি দ্রুত ও আগাম চিহ্নিত করা।
ক্লেইমস ম্যানেজমেন্ট বা দাবি ব্যবস্থাপনা: গ্রাহকদের বিমার দাবির সত্যতা যাচাই এবং ক্ষতিপূরণ প্রদানের প্রক্রিয়া দ্রুত ও স্বয়ংক্রিয় করা।
গ্রাহক সেবা বা কাস্টমার সার্ভিস: গ্রাহকদের যেকোনো জিজ্ঞাসা, অভিযোগ বা সমস্যার তাৎক্ষণিক ও চব্বিশ ঘণ্টা স্বয়ংক্রিয় সেবা প্রদান নিশ্চিত করা।
এভিডেন্ট-এর এই ইনডেক্স বা প্রতিবেদন থেকে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ও বৈশ্বিক প্রবণতা সামনে এসেছে। বর্তমানে সমগ্র বিশ্বজুড়েই বিমা খাতে প্রযুক্তিগত দক্ষতা এবং বিশেষজ্ঞ পেশাদারদের চাহিদা অত্যন্ত দ্রুত গতিতে বৃদ্ধি পাচ্ছে। বড় বড় বিমা কোম্পানিগুলো এখন তাদের সনাতন কার্যপদ্ধতি থেকে বের হয়ে পুরোপুরি প্রযুক্তিনির্ভর হয়ে উঠছে, যার ফলে প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের নিয়োগের হার অনেক বেড়েছে।
প্রতিবেদনের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বর্তমান বৈশ্বিক বিমা খাতের সামগ্রিক কর্মসংস্থানের বাজারে প্রতি ৫০টি পদের বা চাকরির বিপরীতে ১টি পদেই নিয়োজিত রয়েছেন একজন এআই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বিশেষজ্ঞ। অর্থাৎ, সমগ্র বিমা খাতের মোট জনবলের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ এখন এআই বিশেষজ্ঞরা দখল করে নিয়েছেন। বিমা কোম্পানিগুলোর প্রযুক্তি প্রতিভা বা টেক ট্যালেন্ট শিকারের এই তীব্র প্রতিযোগিতা আগামী দিনগুলোতে আরও বৃদ্ধি পাবে এবং এটিই এই খাতের ভবিষ্যৎ রূপরেখা নির্ধারণ করবে বলে প্রতিবেদনে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে।