খবরওয়ালা আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: 4শে শ্রাবণ ১৪৩২ | ১৯ই জুলাই ২০২৫ | 1150 Dhu al-Hijjah 5
যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজায় ভয়াবহ বাস্তবতার মাঝেও চলছে উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের পরীক্ষা। ২০২৩ সালের অক্টোবরে ইসরায়েল ও হামাসের যুদ্ধ শুরুর পর এই প্রথম গাজায় কোনো ধরনের বড় পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। গাজার শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধানে অনলাইনে আয়োজিত এই পরীক্ষা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির ক্ষেত্রে এক গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
ইসরায়েলের সামরিক অভিযানে পুরোপুরি স্থবির হয়ে পড়েছিল গাজার শিক্ষা ব্যবস্থা। বহু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ধ্বংস হয়ে গেছে। কিন্তু সেই বিপর্যয়ের মাঝেও প্রায় ১,৫০০ শিক্ষার্থী ডিজিটাল পদ্ধতিতে এই পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছেন। মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, একটি বিশেষ সফটওয়্যারের মাধ্যমে পরীক্ষাটি নেওয়া হচ্ছে এবং এর জন্য সব ধরনের প্রযুক্তিগত প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়েছে।
নিরাপত্তাজনিত আশঙ্কা মাথায় রেখে অনেক শিক্ষার্থী নিজ নিজ বাসা থেকেই পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছে, কেউ কেউ আবার ক্যাফে, তাঁবু বা আশ্রয়কেন্দ্র থেকেও পরীক্ষা দিচ্ছে, যেখানে ইন্টারনেট ও বিদ্যুতের সংযোগ এখনও কিছুটা সচল রয়েছে। আলজাজিরার প্রতিবেদক তারেক আবু আজজুম গাজার দেইর আল-বালাহ এলাকা থেকে জানিয়েছেন, এই পরীক্ষা শুধু উচ্চশিক্ষার পথই খুলে দেয়নি, বরং গাজার তরুণদের জন্য এক নতুন সম্ভাবনার দিগন্ত তৈরি করেছে। তার ভাষায়, ‘যুদ্ধক্ষেত্র, শ্রেণিকক্ষ বা বই ছাড়াই দুর্বল ইন্টারনেটের মাঝেও গাজার শিক্ষার্থীরা পরীক্ষা দিচ্ছে— যেন তারা যুদ্ধকে তাদের স্বপ্ন ধ্বংস করতে দিতে রাজি নয়।’
এই পরিস্থিতিতে গাজার শিক্ষা মন্ত্রণালয় প্রথমবারের মতো একটি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম চালু করেছে, যাতে শিক্ষার্থীরা ঘরে বসেই পরীক্ষায় অংশ নিতে পারেন। কেন্দ্রীয় গাজা গভর্নরেটের পরীক্ষা পরিচালক মোরাদ আল-আগা জানিয়েছেন, পরীক্ষার জন্য শিক্ষার্থীরা একটি নির্দিষ্ট অ্যাপ ডাউনলোড করছে, তবে তারা বিভিন্ন প্রযুক্তিগত সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে। তিনি জানান, এসব সমস্যা দ্রুত সমাধানে মন্ত্রণালয়কে জানানো হয়েছে।
পরীক্ষার আগে একটি ‘মক টেস্ট’ নেওয়া হয়েছিল, যার মাধ্যমে প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ও শিক্ষার্থীদের প্রস্তুতি যাচাই করা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবতার নিরিখে এই ধরনের পরীক্ষা গ্রহণ অত্যন্ত কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। পরীক্ষার্থী দোহা খাত্তাব বলেন, ‘আমরা অনলাইনে পরীক্ষা দিচ্ছি, কিন্তু এটি খুব কঠিন। ইন্টারনেট দুর্বল, অনেকের কাছে ডিভাইস নেই, পরীক্ষার জন্য নিরাপদ পরিবেশ নেই। আমাদের বইগুলোও বোমায় ধ্বংস হয়ে গেছে।’
শিক্ষার্থীদের সহায়তায় ক্ষতিগ্রস্ত কিছু স্কুল খুলে দেওয়া হয়েছে এবং শিক্ষকরা তাদের আবার গাইড করছেন। শিক্ষিকা ইনাম আবু স্লিসা বলেন, ‘এটি মন্ত্রণালয়ের প্রথম অনলাইন পরীক্ষা। শিক্ষার্থীরা বিভ্রান্ত, তাই আমরা তাদের ধাপে ধাপে সাহায্য করছি।’
জাতিসংঘের তথ্যমতে, ইসরায়েলি হামলায় গাজার ৯৫ শতাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে ধ্বংস হয়েছে। এতে অন্তত ৬ লাখ ৬০ হাজার শিশু স্কুলে যেতে পারছে না। এমনকি জাতিসংঘ পরিচালিত অনেক স্কুল এখন বাস্তুচ্যুতদের আশ্রয়কেন্দ্রে পরিণত হলেও সেগুলোও বারবার ইসরায়েলি হামলার লক্ষ্য হয়েছে।
জাতিসংঘ মানবাধিকার পরিষদে জমা দেওয়া এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইসরায়েল পরিকল্পিতভাবে গাজার শিক্ষা অবকাঠামো ধ্বংস করেছে, যা একটি সম্ভাব্য যুদ্ধাপরাধ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
চরম নিরাপত্তাহীনতা, ধ্বংসস্তুপ আর অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মাঝেও গাজার শিক্ষার্থীরা এই পরীক্ষার মাধ্যমে যুদ্ধকে প্রতিরোধ করছেন। শিক্ষা ও স্বপ্নের প্রতি এই সংগ্রাম যেন প্রমাণ করে, ধ্বংসের ভেতরেও আশার আলো টিকে থাকে।
খবরওয়ালা/এন