খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: শুক্রবার, ২৬ ডিসেম্বর ২০২৫
সংকটাপন্ন পাঁচটি ইসলামী ব্যাংক একীভূত হয়ে গঠিত নতুন ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক’-এর আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দেওয়ার প্রক্রিয়া আগামী সপ্তাহ থেকে শুরু হচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, আমানত বিমা স্কিমের আওতায় প্রাথমিকভাবে গ্রাহকরা এককালীন সর্বোচ্চ দুই লাখ টাকা পর্যন্ত উত্তোলনের সুযোগ পাবেন। আগামী সোমবার অথবা মঙ্গলবার থেকেই এই কার্যক্রম শুরু হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, দীর্ঘদিন ধরে চলমান প্রক্রিয়াগত জটিলতা ও প্রশাসনিক প্রতিবন্ধকতা দূর করা হয়েছে। ফলে নির্ধারিত সময় অনুযায়ী আমানতকারীরা নিজ নিজ ব্যাংকের শাখায় গিয়ে টাকা তুলতে পারবেন। এই অর্থ প্রদান সম্পূর্ণভাবে আমানত বিমা স্কিমের আওতায় করা হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্র জানায়, যেসব গ্রাহকের হিসাবে দুই লাখ টাকা বা তার কম জমা রয়েছে, তারা স্কিম কার্যকর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই একবারে পুরো অর্থ উত্তোলন করতে পারবেন। অন্যদিকে, যাদের আমানতের পরিমাণ দুই লাখ টাকার বেশি, তারা প্রতি তিন মাসে সর্বোচ্চ এক লাখ টাকা করে উত্তোলনের সুযোগ পাবেন। এই প্রক্রিয়া সর্বোচ্চ দুই বছর পর্যন্ত চলবে।
তবে কিছু বিশেষ শ্রেণির গ্রাহকের ক্ষেত্রে এই সীমাবদ্ধতা শিথিল রাখা হয়েছে। ৬০ বছরের বেশি বয়সী প্রবীণ নাগরিক এবং ক্যানসার বা জটিল রোগে আক্রান্ত আমানতকারীরা প্রয়োজন অনুযায়ী যেকোনো পরিমাণ অর্থ উত্তোলন করতে পারবেন। তাদের ক্ষেত্রে মানবিক বিবেচনায় আলাদা ব্যবস্থা রাখা হয়েছে বলে জানিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ওই কর্মকর্তা আরও জানান, একই ব্যাংকে একাধিক হিসাব থাকলে গ্রাহক শুধুমাত্র একটি হিসাব থেকেই নির্ধারিত অর্থ উত্তোলন করতে পারবেন। তবে যদি কারও একাধিক ব্যাংকে হিসাব থাকে, তাহলে প্রতিটি ব্যাংক থেকেই আলাদাভাবে নির্ধারিত সীমার মধ্যে টাকা তোলার সুযোগ থাকবে।
যেসব ব্যাংক একীভূত হয়ে নতুন ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক’ গঠিত হয়েছে, সেগুলো হলো—এক্সিম ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক ও ইউনিয়ন ব্যাংক। এসব ব্যাংক দীর্ঘদিন ধরে আর্থিক সংকটে ভুগছিল।
বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্র জানায়, সাবেক সরকারের সময়ে কয়েকটি প্রভাবশালী গোষ্ঠী জালিয়াতি ও অনিয়মের মাধ্যমে এসব ব্যাংকসহ বিভিন্ন ব্যাংক থেকে বিপুল অঙ্কের ঋণ গ্রহণ করে। ঋণ ফেরত না আসায় এবং অনিয়ন্ত্রিত খেলাপি ঋণের কারণে ব্যাংকগুলো গভীর সংকটে পড়ে। এই পরিস্থিতি সামাল দিতে শেষ পর্যন্ত পাঁচটি ইসলামী ব্যাংক একীভূত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
নতুন গঠিত ব্যাংকের পরিশোধিত মূলধন নির্ধারণ করা হয়েছে ৩৫ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে সরকার দিচ্ছে ২০ হাজার কোটি টাকা এবং আমানতকারীদের শেয়ার থেকে আসছে ১৫ হাজার কোটি টাকা। অনুমোদিত মূলধন ধরা হয়েছে ৪০ হাজার কোটি টাকা। নতুন ব্যাংকের প্রধান কার্যালয় স্থাপন করা হয়েছে ঢাকার সেনা কল্যাণ ভবনে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, এই পাঁচ ব্যাংকের মোট আমানতকারী সংখ্যা প্রায় ৭৫ লাখ। মোট আমানতের পরিমাণ ১ লাখ ৪২ হাজার কোটি টাকা এবং মোট ঋণ রয়েছে প্রায় ১ লাখ ৯৩ হাজার কোটি টাকা, যার বড় একটি অংশ খেলাপি। সারা দেশে এসব ব্যাংকের রয়েছে ৭৬০টি শাখা, ৬৯৮টি উপশাখা, ৫১১টি এজেন্ট ব্যাংকিং আউটলেট এবং ৯৭৫টি এটিএম বুথ।
একীভূতকরণের পর ব্যয় কমাতে একই এলাকায় থাকা একাধিক শাখা এক বা দুইটিতে নামিয়ে আনার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ইতোমধ্যে কর্মীদের বেতন–ভাতা প্রায় ২০ শতাংশ কমানো হয়েছে।
সব মিলিয়ে, দীর্ঘদিন অনিশ্চয়তায় থাকা আমানতকারীদের জন্য এই সিদ্ধান্ত কিছুটা স্বস্তি ফিরিয়ে আনবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে পুরো সংকট কাটিয়ে উঠতে নতুন ব্যাংক ব্যবস্থাপনার দক্ষতা ও দীর্ঘমেয়াদি সংস্কারই হবে মূল চ্যালেঞ্জ।