খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: শুক্রবার, ৬ মার্চ ২০২৬
বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র, প্রখ্যাত গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব এবং জনপ্রিয় ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান ‘ইত্যাদি’-র রূপকার হানিফ সংকেতকে (এ কে এম হানিফ) ২০২৬ সালের ‘স্বাধীনতা পুরস্কার’-এ ভূষিত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। বৃহস্পতিবার (৫ মার্চ ২০২৬) সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠকে সংস্কৃতিতে তাঁর এই অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ দেশের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা দেওয়ার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।
প্রজ্ঞাপন জারির পর থেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ দেশের সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে বইছে আনন্দের জোয়ার। দীর্ঘ চার দশক ধরে সুস্থ বিনোদন, সামাজিক সচেতনতা এবং শেকড় সন্ধানী সংস্কৃতির চর্চায় তাঁর একনিষ্ঠ অবদানের এই রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতিকে সাধারণ দর্শক থেকে শুরু করে বোদ্ধা সমাজ ‘যথাযোগ্য ও সময়োপযোগী’ হিসেবে অভিহিত করছেন।
হানিফ সংকেত কেবল একজন উপস্থাপক নন, বরং তিনি একাধারে পরিচালক, লেখক, প্রযোজক এবং সুরকার। তাঁর সৃজনশীলতার ব্যাপ্তি নিচের সারণিতে তুলে ধরা হলো:
| ক্ষেত্র | উল্লেখযোগ্য অবদান ও বৈশিষ্ট্য |
| টেলিভিশন অনুষ্ঠান | কালজয়ী ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান ‘ইত্যাদি’ (১৯৮৯ থেকে বর্তমান)। |
| পরিচালনা (নাটক) | ‘আয় ফিরে তোর প্রাণের বারান্দায়’, ‘দুর্ঘটনা’, ‘কিংকর্তব্য’, ‘শেষে এসে অবশেষে’। |
| সাহিত্য কর্ম | ‘চৌচাপটে’, ‘এপিঠ ওপিঠ’, ‘ধন্যবাদ’, ‘অকাণ্ড কাণ্ড’, ‘খবরে প্রকাশ’। |
| সঙ্গীত | ‘ইত্যাদি’-র আঞ্চলিক গানের সুরকার ও কণ্ঠশিল্পী। |
| ব্যক্তিত্বের বিশেষত্ব | স্পষ্ট উচ্চারণ, ছন্দময় উপস্থাপনা ও নৈতিকতাবোধ। |
১৯৮৯ সালের মার্চ মাসে বিটিভিতে যাত্রা শুরু করা ‘ইত্যাদি’ আজ আর কেবল একটি অনুষ্ঠান নয়, বরং এটি একটি সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। হানিফ সংকেত এই অনুষ্ঠানটিকে স্টুডিওর কৃত্রিম পরিবেশ থেকে বের করে নিয়ে গেছেন দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে। প্রতিটি পর্বে একটি নির্দিষ্ট জেলার ইতিহাস, ঐতিহ্য এবং লোকজ সংস্কৃতিকে তুলে ধরার মাধ্যমে তিনি তৈরি করেছেন এক জীবন্ত সাংস্কৃতিক মানচিত্র।
তাঁর এই দীর্ঘ যাত্রায় অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করেছেন কিংবদন্তি উপস্থাপক ফজলে লোহানী। হানিফ সংকেত সবসময়ই লোহানীকে তাঁর ‘বন্ধু ও অভিভাবক’ হিসেবে কৃতজ্ঞতার সাথে স্মরণ করেন। লোহানীর ‘যদি কিছু মনে না করেন’ অনুষ্ঠানে হাতেখড়ি হওয়া এই শিল্পী আজ নিজেই একটি মাইলফলক।
হানিফ সংকেতের উপস্থাপনার অন্যতম শক্তিশালী দিক হলো অসংগতির বিরুদ্ধে তীব্র শ্লেষ এবং ইতিবাচকতার জয়গান। তিনি কেবল সমাজের ক্ষতগুলোই দেখান না, বরং প্রচারবিমুখ সেই সব ‘আলোকিত মানুষ’দের খুঁজে বের করেন যারা নীরবে সমাজ বদলে কাজ করছেন। তাঁর প্রতিবেদনের প্রভাবে অনেক এলাকায় স্কুল প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, কোথাও পানীয় জলের ব্যবস্থা হয়েছে, আবার কোথাও অবহেলিত মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে প্রশাসন।
হানিফ সংকেত তাঁর দীর্ঘ কর্মজীবনে অসংখ্য সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি হলো:
স্বাধীনতা পুরস্কার (২০২৬): সংস্কৃতিতে অবদানের জন্য রাষ্ট্রীয় সর্বোচ্চ সম্মান।
একুশে পদক (২০১০): ভাষা ও সংস্কৃতিতে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি।
জাতীয় পরিবেশ পদক: পরিবেশ সচেতনতা বৃদ্ধিতে ভূমিকার জন্য।
মেরিল-প্রথম আলো পুরস্কার: একাধিকবার শ্রেষ্ঠ টিভি অনুষ্ঠানের স্বীকৃতি।
পুরস্কার ঘোষণার পর এক আবেগঘন বার্তায় হানিফ সংকেত বলেন, “এই অর্জন আমার একার নয়। আমি এই পুরস্কার আমার লক্ষ-কোটি দর্শকদের উদ্দেশে উৎসর্গ করছি। সুস্থ সংস্কৃতিই পারে একটি সমাজকে আলোকিত করতে। আমৃত্যু আমি সুস্থ সংস্কৃতির চর্চায় দেশের জন্য কাজ করে যেতে চাই।”
রাষ্ট্রীয় এই স্বীকৃতি কেবল হানিফ সংকেত নামের একজন ব্যক্তিকে সম্মানিত করেনি, বরং এটি টেলিভিশননির্ভর সুস্থ বিনোদন এবং গণমানুষের শুদ্ধ সংস্কৃতির প্রতি রাষ্ট্রের একটি বলিষ্ঠ সমর্থন হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে।