এবিএম জাকিরুল হক টিটন
প্রকাশ: বুধবার, ৩০ জুলাই ২০২৫
আজ শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছি এক আলোকিত মনীষীকে—জাতীয় অধ্যাপক, বিজ্ঞানী, পরিসংখ্যানবিদ, সাহিত্যিক ও শিক্ষাবিদ কাজী মোতাহার হোসেনকে।
তিনি ছিলেন একাধারে বিজ্ঞানের যুক্তিবাদী চেতনা ও সাহিত্য-সংস্কৃতির নান্দনিক রুচির সফল সমন্বয়। একজন দক্ষ দাবারু হিসেবে যেমন সুনাম অর্জন করেন, তেমনি হয়ে উঠেছিলেন কবি কাজী নজরুল ইসলামের অতি ঘনিষ্ঠ বন্ধু। নজরুল ভালোবেসে তাঁকে ডাকতেন ‘মতিহার’।
১৮৯৭ সালের ৩০ জুলাই কুষ্টিয়ার কুমারখালির লক্ষ্মীপুর গ্রামে মাতুলালয়ে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। তাঁদের পৈতৃক নিবাস ছিল রাজবাড়ীর পাংশার বাগমারা গ্রামে।
পরিবারের শিক্ষা-সংস্কৃতির ঐতিহ্যও ছিল সমুজ্জ্বল। তাঁর কন্যাদের মধ্যে জোবায়দা মির্জা ছিলেন ঢাকা কলেজের ভাইস প্রিন্সিপাল এবং ওবায়দা সাদ ময়মনসিংহ ক্যাডেট কলেজের ভাইস প্রিন্সিপাল। তাঁর সন্তানদের মধ্যে রয়েছেন খ্যাতিমান রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী ড. সনজীদা খাতুন, অর্থনীতিবিদ ফাহমিদা খাতুন, লেখক কাজী আনোয়ার হোসেন ও শিক্ষাবিদ মাহমুদা খাতুন।
কাজী মোতাহার হোসেনের শিক্ষাজীবন শুরু হয় কুষ্টিয়ায়। ১৯০৭ সালে নিম্ন প্রাথমিক এবং ১৯০৯ সালে উচ্চ প্রাথমিক পরীক্ষায় বৃত্তি লাভ করেন। ১৯১৫ সালে কুষ্টিয়া মুসলিম হাই স্কুল থেকে ম্যাট্রিক পাস করে ভর্তি হন কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজে। এখানে তিনি অধ্যাপক আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায়ের ছাত্র ছিলেন।
এরপর রাজশাহী কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক এবং ঢাকা কলেজ থেকে পদার্থবিজ্ঞানে অনার্সসহ বিএ পাশ করেন। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে তিনি এমএ সম্পন্ন করেন এবং পরবর্তীতে গণিতে এমএ ও পরিসংখ্যানে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন।
তাঁর কর্মজীবন শুরু হয় ১৯২১ সালে ঢাকা কলেজে ছাত্র থাকা অবস্থায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের ডেমনস্ট্রেটর হিসেবে। পরে সহকারী প্রভাষক, রিডার এবং অধ্যাপক হিসেবে দীর্ঘকাল শিক্ষকতা করেন।
১৯৪৮ সালে তাঁর উদ্যোগেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিসংখ্যান বিষয়ে এমএ কোর্স চালু হয়। তিনি ১৯৬৪ সালে প্রতিষ্ঠিত পরিসংখ্যান গবেষণা ও শিক্ষণ ইনস্টিটিউটের (ISRT) প্রথম পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ১৯৬৯ সালে বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে ইমেরিটাস অধ্যাপক পদে ভূষিত করে।
একাডেমিক কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি সাহিত্য-সাংস্কৃতিক জগতেও তাঁর ছিল গভীর সম্পৃক্ততা। ১৯২৬ সালে কাজী আব্দুল ওদুদ, সৈয়দ আবুল হোসেন ও আবুল ফজলের সঙ্গে তিনি গড়ে তোলেন মুসলিম সাহিত্য সমাজ, যার মুখপত্র ‘শিখা’ পত্রিকা কিছুদিন তিনি সম্পাদনা করেন।
তিনি বাংলা একাডেমির প্রতিষ্ঠাতাদের একজন এবং বিজ্ঞান, সাহিত্য, সংস্কৃতি ও শিক্ষা বিষয়ে বহু গ্রন্থ ও প্রবন্ধের রচয়িতা।
এই মনীষী ১৯৮১ সালের ৯ অক্টোবর মৃত্যুবরণ করেন। তবে জ্ঞান ও মানবতাবাদের যে দীপ্ত অগ্নিশিখা তিনি প্রজ্বলিত করে গেছেন, তা আজও অম্লান।
শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছি এই জ্ঞানতাপসকে।
লেখক, সম্পাদক ও প্রকাশক খবরওয়ালা
খবরওয়ালা/এমএজেড