খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: সোমবার, ২২ জুন ২০২৬
বংশাল থানার একটি হত্যাচেষ্টা মামলায় গ্রেফতার দেখানোর আবেদন শুনানিকালে সাবেক তথ্যমন্ত্রী ও জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) সভাপতি হাসানুল হক ইনু আদালতকে জানিয়েছেন যে, তিনি কারাগারে দুটি আলাদা খাতায় তাঁর বিরুদ্ধে চলমান মামলাসংক্রান্ত যাবতীয় তথ্য সংরক্ষণ করছেন। সোমবার (২২ জুন, ২০২৬) ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট নাজমিন আক্তারের আদালতে শুনানিকালে দেওয়া তাঁর এই বক্তব্যকে কেন্দ্র করে আদালত প্রাঙ্গণে নতুন বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। একই দিনে এই মামলায় ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি ও সাবেক মন্ত্রী রাশেদ খান মেননকেও আদালতে হাজির করে গ্রেফতার দেখানো হয়।
আদালত ও মামলার নথি সূত্রে জানা গেছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ঢাকার চানখাঁরপুল মোড়ে একটি মিছিলে অংশ নেওয়ার সময় মো. মোখলেছিন নামের এক ব্যক্তি গুলিবিদ্ধ হন। পরবর্তীতে তাঁকে স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ (মিটফোর্ড) হাসপাতালে ভর্তি করে চিকিৎসা দেওয়া হয়। এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে ভুক্তভোগী মোখলেছিন গত বছরের ১ জানুয়ারি বংশাল থানায় একটি হত্যাচেষ্টা মামলা দায়ের করেন।
উক্ত মামলায় সোমবার হাসানুল হক ইনুকে আদালতে হাজির করে পুলিশ গ্রেফতার দেখানোর আবেদন করে। শুনানিকালে হাসানুল হক ইনু আদালতকে অবহিত করেন যে, কারাগারে তিনি একটি লাল এবং একটি সবুজ রঙের খাতা ব্যবহার করছেন। এই খাতা দুটিতে তিনি তাঁর বিরুদ্ধে থাকা বিভিন্ন মামলার অগ্রগতি, আদালতের দেওয়া বিভিন্ন আদেশ এবং শুনানির সময় সংশ্লিষ্ট আইনজীবীদের দেওয়া বক্তব্যসমূহ সুনির্দিষ্টভাবে নথিভুক্ত করে রাখছেন। এ ছাড়া শুনানির একপর্যায়ে তিনি আদালতের হাজতখানায় দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করিয়ে রাখার বিষয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেন এবং দেশের বিচার বিভাগের কার্যক্রম নিয়ে সমালোচনামূলক বক্তব্য দেন।
হাসানুল হক ইনুর এই বক্তব্য ও খাতা সংরক্ষণের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলি হারুন অর রশীদ। তিনি জানান, ইনুর এই মন্তব্যের মাধ্যমে মামলার বিভিন্ন বিষয় সংরক্ষণ করার বিষয়টি আদালতের সামনে উঠে এসেছে। তবে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা ইনুর এই ধরনের মন্তব্যের তীব্র বিরোধিতা করেছেন। তাঁদের মতে, আদালতে দাঁড়িয়ে ডায়েরি বা খাতায় আইনজীবীদের বক্তব্য ও আদালতের আদেশ লিখে রাখার এই মন্তব্যটি বিচারক ও আদালতের ওপর এক ধরনের পরোক্ষ চাপ সৃষ্টি বা হুমকির ইঙ্গিত বহন করে। রাষ্ট্রপক্ষ মনে করে, এই বক্তব্যটি আদালত অবমাননার শামিল কি না, তা গভীরভাবে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। আদালত সূত্রে জানা গেছে, হাসানুল হক ইনুর দেওয়া এই বক্তব্য আদালত অবমাননার আওতায় পড়ে কি না, সে বিষয়ে আদালত পরবর্তী সময়ে আনুষ্ঠানিক আদেশ প্রদান করবে।
একই কার্যদিবসে বংশাল থানার ওই একই হত্যাচেষ্টা মামলায় বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি ও সাবেক মন্ত্রী রাশেদ খান মেননকেও কারাগার থেকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়। শুনানিতে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা পুলিশের পক্ষ থেকে দাখিলকৃত গ্রেফতার দেখানোর আবেদনের সপক্ষে আইনি যুক্তি উপস্থাপন করেন। পরে আদালতের অনুমতি সাপেক্ষে রাশেদ খান মেনন নিজেও ব্যক্তিগত বক্তব্য পেশ করেন। উভয় পক্ষের শুনানি গ্রহণ শেষে মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট নাজমিন আক্তার হাসানুল হক ইনু ও রাশেদ খান মেনন উভয়কেই এই মামলায় আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রেফতার দেখানোর (শোন অ্যারেস্ট) আবেদন মঞ্জুর করেন।
নিচে সোমবারের আদালতের শুনানি, সংশ্লিষ্ট মামলা এবং অভিযুক্তদের বর্তমান আইনি পরিস্থিতির বিবরণ টেবিল আকারে উপস্থাপন করা হলো:
| ক্রমিক | বিবরণ ও প্যারামিটার | সংশ্লিষ্ট তথ্য ও ফ্যাক্টস |
| ০১ | আদালতের নাম ও বিচারক | ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত; বিচারক: নাজমিন আক্তার। |
| ০২ | অভিযুক্ত রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ |
১. হাসানুল হক ইনু (সভাপতি, জাসদ ও সাবেক তথ্যমন্ত্রী)।
২. রাশেদ খান মেনন (সভাপতি, ওয়ার্কার্স পার্টি ও সাবেক মন্ত্রী)। |
| ০৩ | সংশ্লিষ্ট থানা ও মামলার ধরন | বংশাল থানা, ঢাকা; দণ্ডবিধির আওতাধীন হত্যাচেষ্টা মামলা। |
| ০৪ | মূল ঘটনার বিবরণ ও তারিখ | ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট চানখাঁরপুল মোড়ে মিছিলে মো. মোখলেছিন গুলিবিদ্ধ হন। |
| ০৫ | মামলা দায়েরের তারিখ | গত বছরের (২০২৫ সালের) ১ জানুয়ারি ভুক্তভোগী কর্তৃক মামলা দায়ের। |
| ০৬ | হাসানুল হক ইনুর বিশেষ উক্তি | কারাগারে লাল ও সবুজ খাতায় মামলার অগ্রগতি ও আইনজীবীদের বক্তব্য নথিভুক্তকরণ। |
| ০৭ | রাষ্ট্রপক্ষের আইনি অবস্থান | ইনুর বক্তব্যকে পরোক্ষ চাপ ও হুমকি হিসেবে আখ্যায়িত করে আদালত অবমাননার দাবি। |
| ০৮ | আদালতের সর্বশেষ আদেশ | উভয় আসামিকে বংশাল থানার মামলায় গ্রেফতার দেখানোর আবেদন মঞ্জুর। |
শুনানি সমাপ্ত হওয়ার পর কড়া পুলিশি পাহারায় দুই সাবেক মন্ত্রীকে পুনরায় প্রিজন ভ্যানে করে আদালতের হাজতখানা হয়ে কেন্দ্রীয় কারাগারে নিয়ে যাওয়া হয়। আদালত অবমাননার আবেদনের বিষয়ে পরবর্তী আইনি পদক্ষেপের জন্য রাষ্ট্রপক্ষ নথিপত্র প্রস্তুত করছে বলে সংশ্লিষ্ট আইনজীবীরা জানিয়েছেন।