খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: 18শে শ্রাবণ ১৪৩২ | ২ই আগস্ট ২০২৫ | 1150 Dhu al-Hijjah 5
গত ৬ জুলাই, রবিবার রাতে ভারতের বিহার রাজ্যের পুর্নিয়া জেলার আদিবাসী অধ্যুষিত ছোট্ট গ্রাম তেতগামায় ঘটেছিল এক বিভীষিকাময় ঘটনা। রাত ১০টার দিকে গ্রামের নিস্তব্ধতা চিরে চেঁচামেচি ও অদ্ভুত মন্ত্রোচ্চারণে ঘুম ভেঙে যায় গ্রামবাসীদের। রাতের অন্ধকারে নিরীহ গ্রামটি পরিণত হয় এক ভয়াল নরকে।
জীবন্ত পুড়িয়ে হত্যা
একই পরিবারের পাঁচজন সদস্য—বাবুলাল ওরাঁও, তাঁর স্ত্রী সীতা দেবী, ছেলে মঞ্জিত, পুত্রবধূ রানি দেবী এবং ৭১ বছর বয়সী মা কাতো ওরাঁও—কে রশি দিয়ে বেঁধে গ্রামের পুকুরপাড়ে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তাঁদের ওপর পেট্রল ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয় এক উন্মত্ত জনতা। এ ঘটনার একমাত্র প্রত্যক্ষদর্শী ও জীবিত ব্যক্তি বাবুলালের কিশোর সন্তান—কোনোভাবে পালিয়ে গিয়ে সে অন্ধকারে লুকিয়ে পড়ে এবং সেখান থেকেই দেখে তার পরিবারের নির্মম পরিণতি।
কুসংস্কার থেকে গণহত্যা
ঘটনার সূত্রপাত হয়েছিল ১০ দিন আগে, যখন স্থানীয় রামদেব ওরাঁওয়ের ছেলে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে মারা যায়। রামদেব বিশ্বাস করেন, তাঁর ছেলের মৃত্যু প্রাকৃতিক নয়, বরং কালোজাদুর ফল। তাঁর সন্দেহ পড়ে কাতো ওরাঁও ও তাঁর পুত্রবধূ সীতা দেবীর ওপর। ওই রাতেই রামদেব গ্রামের পরিচিত এক ওঝাকে সঙ্গে নিয়ে হাজির হন কাতোদের বাড়িতে। ওঝা ঝাড়ফুঁক করে, মন্ত্র পড়ে ঘোষণা দেন—‘কাতো ও সীতা ডাইনি’।
এরপরই জনতা উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। কাতোকে ঘর থেকে টেনে বের করে হুমকি দেওয়া হয়—অসুস্থ ছেলেটিকে আধঘণ্টার মধ্যে সুস্থ না করলে ভয়াবহ পরিণতি হবে। সীতাকে দ্রুত তাঁর মায়ের বাড়ি থেকে ডেকে আনা হয়। তাঁর ফিরে আসার পরপরই শুরু হয় গণপিটুনি। বাবুলাল ও ছেলে মঞ্জিত বাধা দিতে গেলে তাঁরাও আক্রান্ত হন। স্ত্রীকে রক্ষায় এগিয়ে গেলে আক্রান্ত হন রানি দেবীও।
প্রত্যক্ষদর্শীর বর্ণনা
ঘটনার সাক্ষী মনীষা দেবী (ছদ্মনাম) বলেন, ‘আমরা দাঁড়িয়ে থেকে অসহায়ের মতো দেখছিলাম—ওই মানুষগুলো মরিয়া হয়ে নিজেদের বাঁচানোর চেষ্টা করছিল।’
তিনি আরও বলেন, ‘এখনো চোখে লেগে আছে সেই দৃশ্য, এখনো কানে বাজে তাদের আর্তনাদ।’
পুলিশি তথ্য ও প্রশাসনের অবস্থান
মুফাসসিল থানার মাত্র সাত কিলোমিটার দূরে অবস্থিত তেতগামা গ্রামে ঘটনার খবর পুলিশ জানতে পারে ১১ ঘণ্টা পর।
জেলা প্রশাসক অনশূল কুমার বলেন, ‘এটা আমাদের স্পষ্ট ব্যর্থতা। কোথাও না কোথাও ভুল হয়েছে। তবে পুরো সম্প্রদায়ই এতে জড়িত থাকায় খবর পৌঁছাতে দেরি হয়।’
পুলিশের এফআইআরে বলা হয়, ‘জনতা লাঠি, রড ও ধারালো অস্ত্র নিয়ে আসে। পাঁচজনকে রশি দিয়ে বেঁধে গ্রামের পুকুরের দিকে টেনে নিয়ে যায়, পথেই চলতে থাকে মারধর। তাঁরা তখন অর্ধমৃত। এরপর তাঁদের গায়ে পেট্রল ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়।’
পরবর্তীতে তাঁদের দেহ বস্তায় ভরে ট্রাক্টরে করে সরিয়ে নেওয়া হয় এবং স্থানীয় পুকুর থেকে উদ্ধার হয় পাঁচটি পোড়া লাশ।
তদন্ত ও গ্রেপ্তার
পুলিশ তদন্তে উঠে আসে—পুরো গ্রাম থেকে ২৩ জনের নাম পাওয়া গেছে এবং ১৫০-২০০ জন অজ্ঞাত ব্যক্তি ওই উন্মত্ত জনতার অংশ ছিল। চারজনকে, যার মধ্যে ওঝাও রয়েছে, গ্রেপ্তার করা হয়েছে। বাকিরা এখনো পলাতক। অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে গণপিটুনি, বেআইনি জমায়েত, হত্যাচেষ্টা ও আলামত লোপাটসহ একাধিক ধারায় মামলা হয়েছে।
পরিবার ও মনস্তাত্ত্বিক সহায়তা
নিহতদের জীবিত সন্তানরা এখন আশ্রয় নিয়েছে আত্মীয়দের বাড়িতে। জেলা প্রশাসন তাদের খাবার ও জরুরি সহায়তা দিচ্ছে। বাবুলালের কিশোর সন্তান পুলিশ হেফাজতে রয়েছে, তার জন্য মনস্তাত্ত্বিক চিকিৎসা নিশ্চিত করা হয়েছে।
সমাজের অব্যবস্থার প্রতিচ্ছবি
স্থানীয় সমাজকর্মী মীরা দেবী বলেন, ‘এই আদিবাসী গ্রামগুলোতে মানুষের ওঝাদের ওপর প্রবল বিশ্বাস। স্বাস্থ্যকেন্দ্র বা চিকিৎসকের চেয়ে বেশি ভরসা তারা রাখে ঝাড়ফুঁকে।’
গ্রাম পঞ্চায়েত প্রধান সন্তোষ সিং বলেন, ‘শিশুরা স্কুলে যায় না। তারা মা-বাবার সঙ্গে পাশের ইটভাটায় কাজ করে।’
এক স্কুলশিক্ষক জানান, ‘শুধু তিনজন ছাত্রের নাম রয়েছে রেজিস্ট্রারে, কিন্তু কেউ স্কুলে আসে না।’
এক রাতের ভয়াল স্মৃতি
তেতগামা গ্রাম এখন প্রায় জনশূন্য। নিহত বৃদ্ধা কাতোর চার ছেলের পরিবার ছাড়া আর কেউ নেই। তালাবদ্ধ বাড়ি আর পুড়ে যাওয়া ভুট্টার খড় যেন সাক্ষ্য দিচ্ছে সেই নৃশংসতার। মনীষা দেবী বলেন, ‘আমরা দাঁড়িয়ে ছিলাম। কাতো বারবার বলছিলেন, আমাদের দোষ নেই। কিন্তু কেউ শুনল না।’
এক প্রতিবেশী বলেন, ‘ওই রাত আমাদের চোখে কেবল মৃত্যু দেখিয়েছে। ঘুম আসে না। মনে হয়, এখনো কেউ বাইরে ডাকছে…আগুনের লকলকে শিখা যেন চোখে লেগে আছে।’
এই ঘটনা কেবল একটি আদিবাসী গ্রামের ট্র্যাজেডি নয়, বরং আমাদের সমাজে বিদ্যমান কুসংস্কার, অশিক্ষা ও গোষ্ঠীগত উন্মত্ততার এক নির্মম দলিল।
খবরওয়ালা/এসআই