খবরওয়ালা আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: বুধবার, ২৩ এপ্রিল ২০২৫
ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের পর্যটন স্বর্গখ্যাত পেহেলগামের বৈসারণ এলাকার চিরচেনা সবুজ প্রান্তর ও হিমালয়ের কোলে ঘেরা শান্তি আজ রক্তাক্ত। মঙ্গলবার (২২ এপ্রিল) দুপুরে যেভাবে ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে বেছে বেছে হত্যা চালিয়েছে জঙ্গিরা, তা কেবল ভয়াবহ নয়—একটি সাম্প্রদায়িক গণহত্যার বার্তা বহন করে।
পর্যটনের মাঝে হানা দেয় মৃত্যু
মঙ্গলবার দুপুর ২টার দিকে পহেলগাম থেকে প্রায় তিন মাইল দূরে অবস্থিত বৈসারণ এলাকাটি ছিল পর্যটকে পূর্ণ। অনেকে পরিবার নিয়ে এসেছিলেন, শিশুরা ঘোড়ায় চড়ে আনন্দ করছিল, কেউবা ভেলপুরি কিংবা চাট খাচ্ছিলেন।
এমন এক মুহূর্তে আচমকা পাশের জঙ্গল থেকে বেরিয়ে আসে চার থেকে ছয়জন অস্ত্রধারী জঙ্গি। সামরিক পোশাকে সজ্জিত, মুখ ঢাকা, হাতে ছিল স্বয়ংক্রিয় রাইফেল। প্রথমেই এলোমেলো গুলিবর্ষণ শুরু করে তারা।
টার্গেট পরিষ্কার ছিল, অমুসলিমরা
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, কিছুক্ষণের মধ্যেই নির্বিচার গুলির রূপ নেয় বেছে বেছে হত্যাযজ্ঞে। জঙ্গিরা পর্যটকদের মুখোমুখি হয়ে জানতে চায়, ‘তুমি মুসলমান?’ কাউকে কাউকে বলা হয় ‘কালেমা’ পড়তে; ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ।’
যারা কালেমা পড়তে পারেনি, অথবা মুখ বন্ধ রেখেছিল, তাদের মাথায় বা বুকে গুলি করে হত্যা করা হয়। শুধু তাই নয়, অনেকে পুরুষ পর্যটকদের প্যান্ট খুলে দেখে খতনা করা আছে কি না; ইসলাম ধর্মে যা বাধ্যতামূলক। যাদের খতনা ছিল না, তাদের ধরে ধরে হত্যা করা হয়।
নারীদের বলা হয়-‘তোমাদের বাঁচিয়ে রাখছি…’
একজন নারী জানান, তার স্বামীকে গুলি করার পর এক জঙ্গি বলেন, ‘তোমাকে বাঁচিয়ে রাখছি, যাতে তুমি প্রধানমন্ত্রী মোদিকে গিয়ে এই ঘটনা বলতে পারো।’
আরেক নারী বলেন, ‘আমরা ভেলপুরি খাচ্ছিলাম। একজন এসে আমার স্বামীকে দেখে বলে, ‘এটা মুসলমান না।’ তারপর গুলি করে মেরে ফেলে।’
প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, হামলাটি ছিল স্পষ্টভাবে পুরুষ ও অমুসলিমদের লক্ষ্য করে। অনেক নারীকে ছেড়ে দেওয়া হয়।
কে করল এই হামলা?
হামলার দায় স্বীকার করেছে ‘দ্য রেজিস্ট্যান্স ফ্রন্ট (টিআরএফ)’, যা পাকিস্তান-সমর্থিত সন্ত্রাসী সংগঠন লস্কর-ই-তৈয়বার ছায়া সংগঠন হিসেবে পরিচিত।
গোয়েন্দা সংস্থাগুলো জানিয়েছে, এই হামলায় স্থানীয় ও বিদেশি সন্ত্রাসীদের অংশগ্রহণ ছিল। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হয়েছিল তিন থেকে চারজন ছিল, কিন্তু পরে নিশ্চিত হওয়া গেছে চার থেকে ছয়জন ছিল ঘটনাস্থলে।
হাসপাতাল থেকে পাওয়া বিবরণ
একজন বেঁচে যাওয়া পর্যটক বলেন, ‘জঙ্গল থেকে গুলি আসছিল। খুব দূর থেকে নয়। কে কোথায় গুলি করছে বোঝা যাচ্ছিল না। আমরা সবাই শুধু দৌড়াচ্ছিলাম। কেউ পড়ে যাচ্ছিল, কেউ চিৎকার করছিল।’
অনেকে নিজের পরিবারের সদস্যদের চোখের সামনে গুলি খেতে দেখেছেন, অনেকে শিশুকে কোলে নিয়ে দৌড়ে পালিয়েছেন।
কাশ্মীর থেকে দিল্লি; সর্বত্র নিরাপত্তা জোরদার
এই হামলার পরপরই কাশ্মীর উপত্যকা থেকে শুরু করে দিল্লি পর্যন্ত নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। পুলিশ বাহিনী শহর জুড়ে তল্লাশি চালাচ্ছে, পর্যটন এলাকায় বসানো হয়েছে চেকপোস্ট। ড্রোন ও সিসিটিভি দিয়ে নজরদারি চলছে।
বিশেষ করে হিন্দু তীর্থযাত্রীদের জন্য নিরাপত্তা দ্বিগুণ করা হয়েছে। দিল্লি পুলিশের পক্ষ থেকেও জানানো হয়েছে, শহরের প্রতিটি প্রবেশপথে রয়েছে নজরদারি এবং সন্দেহভাজনদের উপর নজর রাখা হচ্ছে।
মানবিক ও রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া
কাশ্মীরের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী ওমর আবদুল্লাহ বলেন, ‘এটি নিছক সন্ত্রাস নয়, এটা ধর্মের ভিত্তিতে বেছে বেছে হত্যা; যা কাশ্মীরের জন্য গভীর সংকেত।’
সামাজিক মাধ্যমে সাধারণ মানুষসহ অনেক বিশিষ্ট নাগরিক এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন।
সূত্র: র্ফাস্টপোস্ট, ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস, এএফপি, সিএনএন নিউজ ১৮, এপি, টাইমস অফ ইন্ডিয়া
খবরওয়ালা/আরডি