খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: সোমবার, ১৫ জুন ২০২৬
ফুটবল বিশ্বের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ আসর ফিফা বিশ্বকাপে নতুন নতুন রেকর্ড তৈরি হওয়া কিংবা পুরোনো রেকর্ড ভেঙে যাওয়ার ঘটনা নিয়মিত চিত্র। তবে চলমান ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপে কোচদের বয়সসংক্রান্ত একটি বিরল রেকর্ড অত্যন্ত স্বল্প সময়ের ব্যবধানে কয়েকবার পরিবর্তিত হওয়ার ঘটনা ঘটেছে। চার দিনের ব্যবধানে রেকর্ডটি তিনবার হাতবদল হওয়ার পর শেষ পর্যন্ত কুরাসাও জাতীয় ফুটবল দলের প্রধান কোচ ডিক অ্যাডভোকাট বিশ্বকাপ ইতিহাসের সবচেয়ে বয়স্ক কোচ হিসেবে একটি নতুন এবং অনন্য রেকর্ড স্থাপন করেছেন।
গত রবিবার (১৪ জুন) আন্তর্জাতিক ফুটবলের অন্যতম পরাশক্তি জার্মানির বিপক্ষে কুরাসাওয়ের প্রথম বিশ্বকাপ ম্যাচে প্রধান কোচ হিসেবে ডাগআউটে দায়িত্ব পালন করেন ডাচ ফুটবল ব্যক্তিত্ব ডিক অ্যাডভোকাট। বর্তমানে তাঁর বয়স ৭৮ বছর। এই ম্যাচ পরিচালনার মাধ্যমে তিনি দীর্ঘদিনের পুরোনো রেকর্ড ভেঙে দিয়ে বিশ্বকাপের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি বয়সে ম্যাচ পরিচালনার গৌরব ও অনন্য কৃতিত্ব নিজের নামে করে নেন।
চলমান ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের উদ্বোধনী পর্বের ম্যাচগুলোতে কোচদের বয়সের দিক থেকে এক নজিরবিহীন প্রতিযোগিতা দেখা গেছে। গত চার দশকেরও বেশি সময় ধরে অক্ষুণ্ণ থাকা এবং পরবর্তীতে ধীরে ধীরে পরিবর্তিত হওয়া রেকর্ডটি এবার মাত্র চার দিনের ব্যবধানে তিনবার পরিবর্তিত হয়।
প্রথমত, এবারের বিশ্বকাপে মেক্সিকোর বিপক্ষে ম্যাচে দক্ষিণ আফ্রিকা জাতীয় দলের কোচ হুগো ব্রুস ৭৪ বছর বয়সে দল পরিচালনা করে সবচেয়ে বয়স্ক কোচের পূর্ববর্তী রেকর্ডটি নিজের করে নেন। তবে তাঁর এই অনন্য রেকর্ডটি দীর্ঘস্থায়ী হতে পারেনি, অক্ষুণ্ণ ছিল মাত্র কয়েক ঘণ্টা। এর পরপরই অনুষ্ঠিত অপর একটি ম্যাচে চেক প্রজাতন্ত্রের (চেকিয়া) কোচ মিরোস্লাভ কুবেক, যাঁর বর্তমান বয়স প্রায় ৭৫ বছর, তিনি মাঠের ডাগআউটে দায়িত্ব পালন করে হুগো ব্রুসের রেকর্ডটি ভেঙে দেন।
সবশেষে, গত রবিবার কুরাসাও দলের হয়ে প্রধান কোচের দায়িত্ব পালন করতে মাঠে নেমে ডিক অ্যাডভোকাট পূর্ববর্তী সকল কোচকে ছাড়িয়ে যান এবং বিশ্বকাপ ফুটবলের ইতিহাসে সবচেয়ে বয়স্ক প্রধান কোচ হিসেবে এক নতুন ও ঐতিহাসিক মাইলফলক তৈরি করেন।
বিশ্বকাপের ইতিহাসে সবচেয়ে বয়স্ক প্রধান কোচদের একটি তুলনামূলক তালিকা এবং তাঁদের বয়স ও দায়িত্ব পালনের বছর নিচে টেবিল আকারে উপস্থাপন করা হলো:
| কোচের নাম | জাতীয়তা | যে দেশের হয়ে দায়িত্ব পালন করেন | বিশ্বকাপের বছর | ম্যাচ পরিচালনার সময় বয়স |
| ডিক অ্যাডভোকাট | নেদারল্যান্ডস | কুরাসাও | ২০২৬ | ৭৮ বছর (বর্তমান রেকর্ডধারী) |
| মিরোস্লাভ কুবেক | চেক প্রজাতন্ত্র | চেক প্রজাতন্ত্র (চেকিয়া) | ২০২৬ | প্রায় ৭৫ বছর |
| হুগো ব্রুস | বেলজিয়াম | দক্ষিণ আফ্রিকা | ২০২৬ | ৭৪ বছর |
| ওত্তো রেহাগেল | জার্মানি | গ্রিস | ২০১০ | ৭১ বছর (দীর্ঘ ১৬ বছর রেকর্ডটি ছিল) |
| সিজার মালদিনি | ইতালি | প্যারাগুয়ে | ২০০২ | ৭০ বছর |
ডিক অ্যাডভোকাট ২০২৪ সালে কুরাসাও জাতীয় ফুটবল দলের প্রধান কোচ হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তাঁর সুনিপুণ ও দক্ষ নির্দেশনায় দলটি চমৎকার পারফরম্যান্স প্রদর্শন করে ২০২৫ সালের নভেম্বর মাসে ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপে খেলার যোগ্যতা বা টিকিট নিশ্চিত করে।
তবে চলতি বছরের (২০২৬) ফেব্রুয়ারি মাসে পারিবারিক কারণে, বিশেষ করে নিজের মেয়ের আকস্মিক অসুস্থতার জন্য তিনি কুরাসাওয়ের প্রধান কোচের পদ থেকে সাময়িকভাবে পদত্যাগ করেছিলেন। তাঁর বিদায়ের পর দলের সহকারী কোচ ফ্রেড রুটেন অন্তর্বর্তীকালীন বা অস্থায়ী প্রধান কোচ হিসেবে দলের দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। পরবর্তী সময়ে মে মাসে ডিক অ্যাডভোকাটের মেয়ের শারীরিক অবস্থার আশাব্যঞ্জক উন্নতি হলে কুরাসাও দলের খেলোয়াড়রা তাঁকে পুনরায় প্রধান কোচের দায়িত্বে ফিরিয়ে আনার জন্য বিশেষ অনুরোধ জানান। খেলোয়াড়দের আন্তরিক অনুরোধের প্রেক্ষিতে শেষ পর্যন্ত মে মাসেই তিনি আবারও কুরাসাও জাতীয় দলের কোচের দায়িত্বে পুনর্বহাল হন এবং দল নিয়ে বিশ্বকাপে আসেন।
চার দশকেরও বেশি সময়ের বর্ণাঢ্য কোচিং অভিজ্ঞতা নিয়ে ডিক অ্যাডভোকাট বিশ্ব ফুটবলের পরিমণ্ডলে অত্যন্ত সমাদৃত ও পরিচিত একটি নাম। ১৯৮০ সাল থেকে তিনি ফুটবল কোচিং পেশার সাথে প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত রয়েছেন। এই দীর্ঘ সময়ে তিনি অত্যন্ত সফলতার সাথে তিন দফায় নিজের মাতৃভূমি নেদারল্যান্ডস জাতীয় ফুটবল দলের প্রধান কোচের গুরুদায়িত্ব পালন করেছেন।
জাতীয় দল ছাড়াও তিনি আন্তর্জাতিক ফুটবল অঙ্গনে বিভিন্ন নামী-দামী ক্লাব ও একাধিক দেশের জাতীয় দলের প্রধান কোচ হিসেবে সফলভাবে কাজ করেছেন। বিশ্ব ফুটবলের ইতিহাসে অত্যন্ত বিরল এক অভিজ্ঞতার মালিক এই ডাচ কোচ। তিনি তাঁর দীর্ঘ ক্যারিয়ারে বিশ্বের মোট আটটি ভিন্ন দেশের জাতীয় ফুটবল দলের প্রধান কোচ হিসেবে দায়িত্ব পালন করার অনন্য রেকর্ড গড়েছেন। এই দেশগুলো হলো— নেদারল্যান্ডস, সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই), দক্ষিণ কোরিয়া, বেলজিয়াম, রাশিয়া, সার্বিয়া, ইরাক এবং বর্তমানের কুরাসাও। চলমান বিশ্বকাপে তাঁর দল কুরাসাও প্রথম ম্যাচে জার্মানির মুখোমুখি হওয়ার মাধ্যমে ফুটবলপ্রেমীরা এক ঐতিহাসিক রেকর্ডের সাক্ষী হলো।