বাংলাদেশে ২০২৫ সালে ব্যাংকে সঞ্চয়কারীরা প্রকৃত অর্থে ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছেন, কারণ মুদ্রাস্ফীতির হার ব্যাংক আমানতের সুদের হারকে ছাড়িয়ে গেছে। এর ফলে নামমাত্র সুদ পাওয়া গেলেও বাস্তবে সঞ্চয়ের ক্রয়ক্ষমতা কমে গেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে আমানতের গড় সুদের হার ছিল প্রায় ৬ শতাংশ। একই সময়ে মুদ্রাস্ফীতির হার ছিল ৮ থেকে ৯ শতাংশের মধ্যে। ফলে প্রকৃত সুদের হার ঋণাত্মক হয়ে প্রায় ২ থেকে ৩ শতাংশে নেমে এসেছে। অর্থাৎ ব্যাংকে টাকা রাখলেও সঞ্চয়কারীদের প্রকৃত আয় বৃদ্ধি পায়নি, বরং কমেছে।
একটি উদাহরণ অনুযায়ী, এক লাখ টাকা ব্যাংকে জমা রাখলে বছরে প্রায় ৬ হাজার টাকা সুদ পাওয়া গেছে। কিন্তু একই সময়ে মুদ্রাস্ফীতির কারণে প্রায় ৯ হাজার টাকার সমপরিমাণ ক্রয়ক্ষমতা কমে গেছে। এতে বাস্তব ক্ষতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩ হাজার টাকা।
সুদ ও মুদ্রাস্ফীতির তুলনা
| বিষয় |
পরিমাণ |
| গড় আমানত সুদের হার |
প্রায় ৬ শতাংশ |
| গড় মুদ্রাস্ফীতি |
৮ থেকে ৯ শতাংশ |
| প্রকৃত সুদের হার |
ঋণাত্মক ২ থেকে ৩ শতাংশ |
| এক লাখ টাকায় সুদ আয় |
প্রায় ৬ হাজার টাকা |
| ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস |
প্রায় ৯ হাজার টাকা |
ব্যাংক খাতে দেখা যায়, ঋণ সুদের হার ১২ শতাংশের বেশি থাকায় ব্যাংকগুলো লাভজনক অবস্থায় রয়েছে। আমানত ও ঋণের সুদের পার্থক্য তিন শতাংশের বেশি থাকায় ব্যাংকগুলোর আয় বজায় আছে। তবে এর পেছনে রয়েছে উচ্চ খেলাপি ঋণ এবং পরিচালন ব্যয়ের চাপ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ব্যাংকগুলো তাদের আমানতের তুলনায় ঋণ প্রদানের হার কিছুটা কমিয়েছে। ফলে সামগ্রিকভাবে ব্যাংকিং খাতে তারল্য বা নগদ অর্থের পরিমাণ বেড়েছে, তবে ঋণ প্রবৃদ্ধি কমেছে।
অন্যদিকে টাকার মান ডলারের বিপরীতে ধীরে ধীরে কমছে। সাম্প্রতিক সময়ে ডলারের মূল্য প্রায় ১২৩ টাকায় পৌঁছেছে, যা আগে ১২২ দশমিক ৩০ টাকায় স্থিত ছিল। ভবিষ্যতে এটি ১৩০ টাকায় পৌঁছাতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
একই সময়ে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধি পেয়েছে, যার প্রভাব পড়েছে দেশের অভ্যন্তরীণ পরিবহন ও উৎপাদন ব্যয়ে। ফলে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়ার চাপ তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে জাহাজ চলাচলে বাধা সৃষ্টি হয়ে কাঁচামাল আমদানির খরচ ১০ শতাংশ থেকে ১৮৩ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে।
এই পরিস্থিতিতে ব্যাংক আমানত ২০২৫ সালের শেষে প্রায় ২১ লাখ কোটি টাকায় পৌঁছেছে, যা আগের বছরের তুলনায় ১১ শতাংশের বেশি বৃদ্ধি। মূলত স্বল্প ও মধ্যম আয়ের আমানতকারীদের কারণে এই প্রবৃদ্ধি হয়েছে। দুই লাখ টাকা পর্যন্ত আমানত এবং ২৫ লাখ টাকা পর্যন্ত আমানতের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। তবে বড় অঙ্কের আমানতকারীদের সংখ্যা কমেছে।
এছাড়া বিভিন্ন বিশেষজ্ঞের মতে, সীমিত বিনিয়োগ সুযোগ, জমির উচ্চ মূল্য এবং পুঁজিবাজারের অস্থিরতার কারণে সাধারণ মানুষ ব্যাংকেই সঞ্চয় রাখতে বাধ্য হচ্ছে। ফলে প্রকৃত আয় কম হলেও আমানত প্রবাহ অব্যাহত রয়েছে।