খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: 25শে ফাল্গুন ১৪৩২ | ৯ই মার্চ ২০২৬ | 1150 Dhu al-Hijjah 5
ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর নির্বাচনী প্রচারণায় বারবার নিজেকে ‘শান্তির প্রেসিডেন্ট’ হিসেবে দাবি করেছিলেন। তাঁর মূল প্রতিশ্রুতি ছিল আমেরিকার ওপর জেঁকে বসা ‘চিরন্তন যুদ্ধ’ (Forever Wars) বন্ধ করা। কিন্তু ২০২৬ সালের শুরুতে এসে দেখা যাচ্ছে এক সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র। যে নেতা নোবেল শান্তি পুরস্কারের আশায় দিন গুনছিলেন, তিনিই এখন মধ্যপ্রাচ্যে এক বিশাল যুদ্ধের নায়ক। প্রশ্ন উঠেছে, কেন তিনি এই সংঘাতের পথে হাঁটলেন?
গত শুক্রবার, যখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এয়ারফোর্স ওয়ানে চড়ে টেক্সাসের কর্পাস ক্রিস্টি শহরের দিকে যাচ্ছিলেন, তখনই তিনি ইরানের বিরুদ্ধে সরাসরি যুদ্ধ শুরুর চূড়ান্ত নির্দেশ দেন। উড়োজাহাজে তাঁর সাথে ছিলেন কট্টরপন্থী রিপাবলিকান সিনেটর জন করনিন ও টেড ক্রুজ। সেখানে উপস্থিত ছিলেন প্রবীণ অভিনেতা ডেনিস কোয়েডও। এই ফ্লাইটের মধ্যেই রিপাবলিকানদের আদর্শিক নেতা রোনাল্ড রেগ্যানের চারিত্রিক দৃঢ়তার সাথে ট্রাম্পের বর্তমান অবস্থানের এক নাটকীয় মেলবন্ধন ঘটানো হয়। ডেনিস কোয়েড রসিকতা করে বলেন, “ডোনাল্ড ট্রাম্প রেগ্যানের মতোই শক্তিশালী।” এই প্রতীকী বার্তাই যেন ট্রাম্পকে যুদ্ধের ময়দানে অবতীর্ণ হতে মানসিকভাবে আরও উদ্বুদ্ধ করে।
ট্রাম্পের এই নাটকীয় পরিবর্তনের পেছনে একাধিক ভূ-রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত কারণ কাজ করেছে। একদিকে যেমন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর প্রভাব ছিল স্পষ্ট, অন্যদিকে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরোকে অপহরণ করার সফল অভিযান ট্রাম্পের আত্মবিশ্বাসকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছিল।
ট্রাম্পের যুদ্ধযাত্রার প্রধান প্রভাবকসমূহ:
| প্রভাবক/ব্যক্তি | ভূমিকা ও অবদান |
| বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু | ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় হামলার জন্য ট্রাম্পকে প্ররোচিত ও রাজি করানো। |
| মোহাম্মদ বিন সালমান | সৌদি যুবরাজ হিসেবে টেলিফোনে ইরানের বিরুদ্ধে কঠোর সামরিক পদক্ষেপের চাপ প্রয়োগ। |
| নিকোলা মাদুরো অভিযান | ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্টকে তুলে আনার সাফল্য ট্রাম্পকে সামরিক শক্তির নেশায় বুঁদ করে। |
| অভ্যন্তরীণ সংকট | জেফরি এপস্টিন কেলেঙ্কারি ও ব্যক্তিগত বিতর্ক থেকে জনমনোযোগ সরানোর চেষ্টা। |
ট্রাম্পের এই অভিযানের নাম দেওয়া হয়েছে ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’। জর্জ ডব্লিউ বুশের পর ট্রাম্পই প্রথম মার্কিন প্রেসিডেন্ট, যিনি সরাসরি কোনো দেশের শাসকগোষ্ঠী পরিবর্তনের (Regime Change) লক্ষ্য নিয়ে যুদ্ধে নেমেছেন। যদিও তিনি শুরুতে বড় ধরনের স্থলযুদ্ধের বিরোধী ছিলেন, তবে মার্কিন বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র শক্তির ওপর তাঁর অগাধ বিশ্বাস ছিল।
হামলাটি এমনভাবে পরিকল্পনা করা হয়েছিল যেন তা সরাসরি ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে লক্ষ্য করে পরিচালিত হয়। শনিবার সকালে তেহরানের কেন্দ্রীয় কম্পাউন্ডে খামেনি যখন নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের সাথে বৈঠকে ছিলেন, ঠিক তখনই ১০০টিরও বেশি মার্কিন যুদ্ধবিমান এবং টমাহক ক্ষেপণাস্ত্র ইরানের আকাশে গর্জে ওঠে।
যুদ্ধের আগে স্টিভ উইটকফ এবং জ্যারেড কুশনার কয়েক দফা ইরানি কূটনীতিকদের সাথে বৈঠক করেছিলেন। ইরান তাদের ইউরেনিয়াম মজুত ছেড়ে দেওয়ার মতো বড় ছাড় দিলেও ট্রাম্পের চাহিদা ছিল আরও বেশি। তিনি চাইছিলেন ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি স্থায়ীভাবে বন্ধ করা। এই অনমনীয় অবস্থানই শেষ পর্যন্ত আলোচনার টেবিল থেকে রণক্ষেত্রে রূপ নেয়।
ট্রাম্পের ‘মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন’ আন্দোলনের মূল ভিত্তি ছিল বিদেশের যুদ্ধে নাক না গলানো। কিন্তু বর্তমানে তিনি ইরানের ৪৭ বছরের শাসনব্যবস্থা উৎখাতের ডাক দিয়ে এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে পা বাড়িয়েছেন। ‘শান্তির প্রেসিডেন্ট’ হতে চাওয়া ট্রাম্প এখন নিজেই এক চিরকালীন যুদ্ধের বৃত্তে বন্দি। এই যুদ্ধ কখন শেষ হবে, তা এখন আর কেবল ওয়াশিংটনের হাতে নেই, বরং তা নির্ভর করছে তেহরানের পাল্টা আঘাতের সক্ষমতার ওপর।