এবিএম জাকিরুল হক টিটন
প্রকাশ: শনিবার, ২৪ জানুয়ারি ২০২৬
আমাদের সমাজব্যবস্থার নির্মম ব্যর্থতার দলিল
ক্ষুধার জ্বালা সইতে না পেরে এক তরুণী মা তাঁর আদরের সন্তানকে নিয়ে আত্মহননের পথ বেছে নিতে বাধ্য হয়েছেন—এই খবর কোনো বিচ্ছিন্ন দুর্ঘটনা নয়। এটি আমাদের সমাজব্যবস্থা ও রাজনীতির এক নির্মম, নগ্ন ব্যর্থতার দলিল।
এক বছরেরও বেশি সময় ধরে কারাবন্দি ছাত্রলীগের এক কর্মী সাদ্দামের স্ত্রী—অতীব দরিদ্র, ক্লান্ত ও স্বল্প বয়সী এই নারী—হয়তো দিনের পর দিন মানুষের দুয়ারে দুয়ারে ঘুরেছেন সাহায্যের আশায়। শেষ পর্যন্ত বুঝে গেছেন, যার স্বামী জেলে, তার পাশে দাঁড়ানোর মানুষ খুব কমই থাকে। রাজনৈতিক পরিচয় এখানে আশীর্বাদ নয়, বরং সামাজিক বিচ্ছিন্নতার এক ভয়ংকর দাগ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
কে জানে, স্বামীর রাজনৈতিক পরিচয়ের ভয়ে পাড়া–মহল্লা তাকে একঘরে করে দিয়েছিল কি না। কে জানে, সাহায্য করতে গিয়েও কতজন ভয়ে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। কিন্তু নিশ্চিতভাবে বলা যায়—ক্ষুধা, অনাহার আর অপমানের সম্মিলিত চাপ একজন মাকে এমন ভয়ংকর সিদ্ধান্তের দিকে ঠেলে দেয়, যেখানে সন্তানের জীবনকেও সে নিজের জীবনের সঙ্গে শেষ করে দিতে বাধ্য হয়।
রাজনীতি কি সত্যিই আমাদের এতটা অমানবিক ও নিষ্ঠুর হতে শেখায়?
কতটা অসহায় হলে একজন তরুণী মা তার প্রাণপ্রিয় সন্তানকে হত্যা করে নিজেও মৃত্যুকে আলিঙ্গন করে—এই প্রশ্ন আমাদের বিবেককে তাড়িয়ে বেড়ানো উচিত।
এই মেয়েটির মৃত্যু কি আমাদের লজ্জিত করে?
আমাদের বিবেকে কি এতটুকু দংশন জাগায়?
সম্ভবত না—কারণ আমরা এমন এক সমাজ গড়ে তুলেছি, যেখানে অনেকেই বিপুল অর্থ-বিত্তের মালিক হয়ে বিদেশে বিলাসী জীবন যাপন করেন, অথচ এমন অসহায় মানুষের খোঁজ নেওয়ার সময় বা দায় কেউ অনুভব করেন না।
এই মৃত্যু আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়—রাজনৈতিক দল, মতাদর্শ বা পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর সংস্কৃতি আমরা গড়ে তুলতে পারিনি। আমরা ব্যর্থ হয়েছি পরিবারকে নিরাপত্তা দেওয়ার মৌলিক দায়িত্বে।
সবচেয়ে নির্মম ও হৃদয়বিদারক বিষয় হলো—
উল্লেখ্য যে, ছাত্রলীগের সেই গ্রেপ্তারকৃত নেতা তাঁর মৃত প্রিয়তম স্ত্রী ও নিষ্পাপ সন্তানের মুখ শেষবারের মতো দেখার জন্য প্যারোলে মাত্র দুই–চার ঘণ্টার জন্য মুক্তিও এই সরকার দেয়নি। রাষ্ট্রের কঠোরতা এখানে মানবিকতাকে সম্পূর্ণভাবে গ্রাস করেছে।
যে দলই করো সাথীরা—রাজনীতিতে নামার আগে অন্তত এটুকু নিশ্চিত করো, যেন তোমার স্ত্রী আর সন্তানকে এমন করুণ ভাগ্য বরণ করতে না হয়। আদর্শ যদি পরিবারকে রক্ষা করতে না পারে, তবে সেই আদর্শ কিসের?
পরপারে ক্ষুধা, তৃষ্ণা, মান-অপমান, তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য কিছু আছে কি না আমরা জানি না। যদি থেকেও থাকে, প্রার্থনা—মহান আল্লাহ্ রাব্বুল আলামিন যেন এই মা ও তাঁর নিষ্পাপ সন্তানকে সেখানে নিরাপদে রাখেন, শান্তিতে রাখেন।
আর আমাদের জন্য রেখে যান এক কঠিন প্রশ্ন—
আর কত লাশ পড়লে আমাদের রাজনীতি ও সমাজে মানবিকতা ফিরবে?
লেখক- সম্পাদক ও প্রকাশক