খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: শনিবার, ৯ আগস্ট ২০২৫
গাজীপুরের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ক্রমেই ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে। গত সাত মাসে গাজীপুর মহানগর ও জেলার পাঁচটি উপজেলায় মোট ১০৩টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। রাজনৈতিক বিরোধ, মাদক, চাঁদাবাজি, ছিনতাই, জমি-সংক্রান্ত বিরোধ, পারিবারিক কলহসহ নানা কারণে এসব খুন হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
সর্বশেষ ঘটনাগুলোর মধ্যে রয়েছে—গত বৃহস্পতিবার রাতে চান্দনা চৌরাস্তা এলাকায় দা ও চাপাতির আঘাতে সাংবাদিক মো. আসাদুজ্জামান তুহিনকে প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যা। এর একদিন আগে সাহাপাড়ায় আরেক সাংবাদিক আনোয়ার হোসেনকে টেনেহিঁচড়ে পেটানো ও ইট দিয়ে পা থেঁতলে দেওয়া হয়। গুরুতর আহত তিনি বর্তমানে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। শুক্রবার টঙ্গী স্টেশন রোড এলাকায় টঙ্গী–ঘোড়াশাল আঞ্চলিক সড়কের পাশে একটি ব্যাগে মিলেছে এক যুবকের খণ্ডিত মরদেহ।
খুনের ঘটনাগুলো এত ঘন ঘন ঘটছে যে, মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। টঙ্গী, চান্দনা, গাজীপুর চৌরাস্তা ও নগরীর কিছু নির্দিষ্ট এলাকা অপরাধীদের নিরাপদ আস্তানায় পরিণত হলেও, দৃশ্যমান কোনো কঠোর ব্যবস্থা চোখে পড়ছে না।
গাজীপুর জেলায় সাম্প্রতিক পারিবারিক খুনের ঘটনাও আলোচিত। গত শনিবার রাতে গাজীপুর শহরে স্ত্রী মারুফা আক্তারকে শ্বাসরোধ ও পিটিয়ে হত্যার পর ঘরে লাশ রেখে বাইরে আগুন লাগিয়ে দেন স্বামী মিজানুর রহমান। পুলিশ জানিয়েছে, পারিবারিক কলহের জেরেই এ ঘটনা। এর আগে ৭ আগস্ট শ্রীপুরের মধ্যপাড়ায় স্বামী নূরুল ইসলামের হাতে নিহত হন গৃহবধূ সুইটি আক্তার। হত্যার পর ক্ষুব্ধ গ্রামবাসী নূরুলের দুটি বাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয়।
এ ছাড়া ২৮ জুন কোনাবাড়ীর গ্রিনল্যান্ড গার্মেন্টসের ভেতরে চোর সন্দেহে হৃদয় মিয়া নামে এক যুবককে গণপিটুনি দিয়ে হত্যা করা হয়। প্রায়ই ভাওয়াল জাতীয় উদ্যান ও পার্শ্ববর্তী বনাঞ্চল থেকে অজ্ঞাতনামা লাশ উদ্ধার হচ্ছে, যাদের পরিচয় আর মেলে না।
পুলিশ সূত্র জানায়, গত সাত মাসে গাজীপুর জেলার শ্রীপুর, কালিয়াকৈর, কালীগঞ্জ, কাপাসিয়া ও সদর থানায় ৫৯টি হত্যাকাণ্ড ঘটে, যার মধ্যে ৪৮টির রহস্য উদ্ঘাটন হয়েছে এবং ৫২ জন গ্রেপ্তার হয়েছে। জেলা পুলিশ সুপার চৌধুরী মো. যাবের সাদেক বলেন, “গত ১৭ বছরে একটি প্রজন্ম নষ্ট হয়ে গেছে। সামাজিক অবক্ষয় এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, এখন অপরাধ করতে তাদের কোনো ভয় লাগে না।”
গাজীপুর মহানগর পুলিশের হিসাব অনুযায়ী, মহানগরের ৮টি থানায় সাত মাসে ৩৫টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে—সবচেয়ে বেশি সদর থানায় ১১টি, টঙ্গী পূর্বে ৮টি, টঙ্গী পশ্চিমে ৪টি, কাশিমপুরে ৪টি, কোনাবাড়ীতে ৩টি, বাসনে ৫টি এবং পুবাইল ও গাছায় ২টি করে।
ছিনতাইয়ের সময় খুনও হচ্ছে মানুষ। ১১ জুলাই রাতে টঙ্গীতে ছিনতাইকারীর হামলায় নিহত হন কলেজ শিক্ষার্থী মাহফুজুর রহমান। ১৭ মে টঙ্গী ফ্লাইওভারে খুন হন রঞ্জু (৩০)। চাঁদাবাজির বিরোধে ২৭ মে বৃদ্ধ নাসির পালোয়ানকে কিশোর গ্যাংয়ের হামলায় গুরুতর আহত অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি করা হলে, ২ জুলাই তার মৃত্যু হয়।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও সাহিত্যিক মমিনুল ইসলাম বলেন, ‘সামাজিক অবক্ষয়, পারিবারিক ভাঙন ও দুর্বল আইন প্রয়োগের কারণে অপরাধ বেড়েই চলেছে। পুলিশ প্রশাসনের ভঙ্গুরতা সার্বিক নিরাপত্তাকে ঝুঁকির মুখে ফেলেছে।’
খবরওয়ালা/এমএজেড